দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের বাড়ির উঠোনে আবারও হাঁটুসমান বন্যার পানি। সেই পানির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন জোসনা বেগম। তাঁর কাছে এই পানি শুধু বন্যার নয়, ছেলের স্মৃতিও বয়ে আনে। দুই বছর আগে এমনই এক বন্যায় ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সাঁতার কেটে বাড়ি ফিরেছিলেন ছেলে ওয়াসিম আকরাম। এবারও বন্যা এসেছে, কিন্তু আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলেও আর ফেরেনি সেই ছেলে।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জোসনা বেগম স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ছেলেকে খুব মনে পড়ে। দুই বছর আগে এমন বন্যার মধ্যেই সাঁতার কেটে বাড়ি এসেছিল ওয়াসিম। বাজার থেকে শুকনো খাবার এনেছিল। বাড়ির সব কাজও করেছিল।
ছেলেকে হারানোর পর কখনো মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত তার কণ্ঠস্বর বারবার শোনেন, কখনো চুপচাপ বসে থাকেন। দিনের বেলা সুযোগ পেলেই চলে যান ছেলের কবরের পাশে।
পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মেহেরনামার চৈরভাঙ্গা এলাকায় ইজারা নেওয়া একটি মৎস্যঘেরে কথা হয় ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলমের সঙ্গে। তিনি জানান, গত এক বছর ধরে দিনের বেশির ভাগ সময় সেখানেই কাটান। ঘের থেকে কিছুটা দূরেই ছেলের কবর। সেখানে প্রতিদিনই যান তিনি।
ছেলে হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘দুই বছর হলো ছেলের মুখে “বাবা” ডাক আর শুনতে পাই না। এই কষ্টটা বুকের ভেতর জমে আছে।
‘এখন আমার নাম-যশ, খ্যাতি—কিছুরই দরকার নেই। ওয়াসিম স্মৃতি হয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকুক, সেটাই চাই।’
ছেলেকে নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম সে সরকারি চাকরি করুক। কিন্তু সে রাজি ছিল না। সে কানাডা যেতে চেয়েছিল।’
ওয়াসিমের বাবা জানান, বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় জমি বন্ধক রেখে ১৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। বড় ছেলে ও ওয়াসিম মিলে সংসারটা দাঁড় করাতে চেয়েছিল। ধীরে ধীরে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিল পরিবারটি। কিন্তু ওয়াসিমের মৃত্যু তাদের সবকিছু এলোমেলো করে দেয়।
ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ৫ এপ্রিল ২২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। তবে মামলার অগ্রগতির বিষয়ে অবগত নন শফিউল আলম।
অন্যদিকে, ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘মামলার বিষয়ে আমি খুব একটা জানি না, খোঁজও রাখি না। মামলার বাদী তার মা। তবে আমি একটাই কথা বলব—দোষীদের শাস্তি হোক, আর নির্দোষরা যেন মুক্তি পায়। কেউ বিনা অপরাধে শাস্তি পেলে আমাদের ছেলেমেয়েরা কবরে শান্তি পাবে না।’
জোসনা বেগম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার সন্তানের জন্য কিছু একটা করতে বলেছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। অনেকে সহযোগিতা করেছেন। তবে দুই বছর হলো, এখনো কোনো বিচার হলো না। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’
ওয়াসিমের বোন সাবরিনা ইয়াসমিন সোমা বলেন, ‘আমার ভাই দেশের গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছেন। আজ দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। আমাদের একটাই চাওয়া, আমার ভাইসহ যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের হত্যাকারীদের বিচার হোক। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে।’
ওয়াসিমের পরিবার জানিয়েছে, বর্তমান সরকার ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকে তিন দফায় ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছে। এর আগে বিএনপি থেকে ১ লাখ, জামায়াতে ইসলামী থেকে ২ লাখ এবং এনসিপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছে পরিবারটি।
জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহ বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ওয়াসিমের কবর পাকা করা হয়েছে, নেমপ্লেট বসানো হয়েছে। “ওয়াসিম স্মৃতি সংসদ” গঠন করা হয়েছে। তাদের বাড়ির সড়ক সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ওয়াসিম আকরাম পেকুয়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ওয়াসিম ছিলেন তৃতীয়। বড় ভাই আরশাদ হোসেন ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ২৫ দিনের মধ্যে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। বড় বোন মর্জিনা আক্তার এবং ছোট বোন রুশনি আক্তারের বিয়ে হয়েছে। অপর ছোট বোন সাবরিনা ইয়াসমিন সোমা চট্টগ্রামের একটি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।