ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
অর্থের অভাবে অকেজো দুই সি-অ্যাম্বুলেন্স, নৌপথে জীবন-মৃত্যুর লড়াই
✎ অবজারভার প্রতিনিধি
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩৩ পিএম
X

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেওয়া হয়েছিল দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিচালন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি কোটি টাকার অ্যাম্বুলেন্স দুটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে তিন বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে আবারও কাঠের ট্রলার ও সাধারণ নৌযানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন রোগীরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাত-বিরাতে মুমূর্ষু রোগী ও প্রসূতিদের কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে প্রতিকূল আবহাওয়া ও নৌযানের সংকটের কারণে জীবনঝুঁকিও তৈরি হয়।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) এবং কুতুবদিয়ার সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা রিসার্চ ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের (আরটিএমআই) মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) অ্যাম্বুলেন্স দুটি ক্রয় করে। পরে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে সেগুলো সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হস্তান্তর করা হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় চালক, সহকারী, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখা সম্ভব হয়নি।

পরিচালন ব্যয় বেশি, মিলছে না সাড়া

মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, মহেশখালী-কক্সবাজার ৮ কিলোমিটার নৌপথে রোগী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত সি-অ্যাম্বুলেন্সটি ২০২৩ সালের মে মাসে সরবরাহ করা হয়। চালুর পর ২০২৩ সালে ৮৫ জন এবং ২০২৪ সালে ১৭৯ জন রোগীকে কক্সবাজারে আনা-নেওয়া করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ফাহিম শাহরিয়ার শাওন বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে রেফার করতে হয়। এর মধ্যে মুমূর্ষু রোগী ও জটিল গাইনি রোগীও থাকেন। অনেক সময় রাতের বেলায় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন এমন রোগীকেও পাঠাতে হয়।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মহেশখালী জেটিঘাটের পূর্বপাশের খালে নোঙর করে রাখা সি-অ্যাম্বুলেন্সটি জোয়ারে পানিতে ভাসে, আর ভাটায় কাদায় আটকে পড়ে। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় এটি দেখভালেরও কেউ নেই।

মহেশখালী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটিতে ১৫০ লিটার অকটেন ও ৫ লিটার মবিল দিলে চারবার যাওয়া-আসা করা যায়। একবার যাওয়া-আসায় জ্বালানি খরচ হয় প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। এটি একসঙ্গে ৮ থেকে ১০ জন যাত্রী বহন করতে সক্ষম এবং ৪০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন। তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর থেকে অ্যাম্বুলেন্সটি আর চালু রাখা যায়নি।

তিনি জানান, অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ (আইএসও) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় এখনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। চলতি জুলাই মাসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

মহেশখালীর বাসিন্দা মাহবুব রোকন বলেন, দ্বীপ এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা এখনো অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে সি-অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় জটিল রোগীদের জেলা সদরে পৌঁছাতে নৌযানও পাওয়া যায় না।

অকেজো ব্যাটারি, জোয়ারে তলিয়ে যায় অ্যাম্বুলেন্স

অন্যদিকে কুতুবদিয়ায় দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটির অবস্থা আরও শোচনীয়। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার পর চলতি বছরের মে মাসে বড়ঘোপ ঘাটে জোয়ারের পানিতে সেটি তলিয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি কোনো কাজে আসেনি। ফলে জটিল রোগী নিয়ে সাড়ে ৩ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিতে এখনো প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করতে হয়।

সরেজমিনে বড়ঘোপ জেটিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি ও জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে।

বড়ঘোপ ঘাটের টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি কার্যত কখনোই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দিতে পারেনি। এখন এটি দেখাশোনারও কেউ নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, কুতুবদিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসাসুবিধার অভাবে রোগীদের সাগরপথে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে যেতে হয়।

কুতুবদিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে একটি ঘূর্ণিঝড়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে প্রদানকারী সংস্থা সেটি সংস্কার করে দেয়। বর্তমানে এর ব্যাটারির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের সময় নৌবাহিনী অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটি অকেজো থাকায় ব্যবহার সম্ভব হয়নি। একবার যাওয়া-আসায় প্রায় ৫ হাজার টাকার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। এ ব্যয় বহন করা কঠিন। গত ডিসেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক, আইওএম ও ইউনিসেফকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে তারা নতুন করে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়নি।

সমাধানের অপেক্ষায় দ্বীপবাসী

সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখতে নতুন প্রকল্প বা বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে আবারও চিঠি দেওয়া হবে। পাশাপাশি আইএসও প্রকল্পের আওতায় পরিচালনার সুযোগ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা সি-অ্যাম্বুলেন্সগুলো অচল ফেলে না রেখে দ্রুত সচল করা উচিত। অন্যথায় জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জীবনঝুঁকি আরও বাড়বে।

এসইউ/আরএন



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝