এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ, সোনার মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে এর বিপরীতে কমেছে নিট উদ্বৃত্ত (লাভ)। প্রশ্ন উঠছে-সম্পদ ও আয় বাড়ার পরও কেন কমলো লাভ?
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা এক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬ লাখ ৪৭ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে সম্পদ বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা বা প্রায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পদ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল বৈদেশিক মুদ্রায় ধারণ করা আর্থিক সম্পদ। এক বছরে এ খাতের সম্পদ বেড়েছে ৭৬ হাজার ৯৫ কোটি টাকা, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকায়।
এর মধ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি আইএমএফ-সংশ্লিষ্ট সম্পদও বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির প্রভাবও পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে। এক বছরে সোনা ও রুপার মূল্য বেড়েছে ৯৬৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সোনা লেনদেন থেকে আয় প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বৈদেশিক সম্পদ বাড়লেও দেশীয় মুদ্রায় আর্থিক সম্পদের পরিমাণ কমেছে ১৫ হাজার ৫২২ কোটি টাকা।
তবে পুনর্বিক্রয় চুক্তি (রেপো) ভিত্তিক সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে সরকারকে দেওয়া ঋণ কমেছে প্রায় ৫০ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। এছাড়া স্থানীয় মুদ্রায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণ এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
দেশীয় মুদ্রার আর্থিক সম্পদ থেকে সুদ আয়, বৈদেশিক সম্পদ থেকে সুদ আয় এবং অন্যান্য উৎস থেকে আয় বৃদ্ধির ফলে মোট আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে।
তাহলে লাভ কমলো কেন?আয় বাড়লেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট উদ্বৃত্ত কমে হয়েছে ৩৪ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর প্রধান কারণ বৈদেশিক মুদ্রার পুনর্মূল্যায়ন থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ২২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ পরিচালন আয় বাড়লেও পুনর্মূল্যায়নজনিত আয় কমে যাওয়ায় নিট উদ্বৃত্ত হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ব্যয়ও বেড়ে ৯ হাজার ২২৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
দায় ও ইক্যুইটিও বেড়েছেএক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট দায় বেড়েছে ৪০ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ইক্যুইটি বেড়েছে ২০ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। পুনর্মূল্যায়ন সঞ্চিতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত সঞ্চিতি এবং অন্যান্য সংরক্ষিত তহবিল বৃদ্ধির কারণে ইক্যুইটিতে এ প্রবৃদ্ধি এসেছে।
বিশেষজ্ঞ যা বলছেনসাবেক অর্থসচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্বৃত্তকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লাভ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, যার আয় মূলত মুদ্রা ইস্যু, মুদ্রানীতি পরিচালনা এবং বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম থেকে আসে।
তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই উদ্বৃত্ত যেন অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে ব্যয় না হয়ে সরকারের কোষাগারে জমা হয় এবং জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয়। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ মালিক সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত সরকারের নন-ট্যাক্স রাজস্ব হিসেবে যুক্ত হয়।
সর্বশেষ আর্থিক চিত্র বলছে, বৈদেশিক সম্পদ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে নিট উদ্বৃত্ত কমে যাওয়ার কারণ পরিচালন দুর্বলতা নয়; বরং বৈদেশিক মুদ্রার পুনর্মূল্যায়নজনিত আয় হ্রাস এবং ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান ইতিবাচক থাকলেও ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
-টিএস