বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই শ্লথ হয়েছে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) থেকে আয় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক রপ্তানি বেড়েছে ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধীরগতির মধ্যেও পোশাক বহির্ভূত খাতের শক্তিশালী পারফরম্যান্সই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক রেখেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি।
আরএমজির প্রবৃদ্ধি সীমিত
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে আয় হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
মোট ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে আরএমজি খাত থেকে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৮৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের এই সীমিত প্রবৃদ্ধির কারণেই সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও তুলনামূলক ধীর হয়েছে।
ভরসা হয়ে উঠছে নন-অ্যাপারেল
সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে পোশাক বহির্ভূত (নন-অ্যাপারেল) খাত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে এ খাতের রপ্তানি ১৩ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নন-অ্যাপারেল খাতের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি না থাকলে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারত।
বিজিএমইএর দৃষ্টিতে প্রত্যাশার চেয়ে কম
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে আরএমজি খাতের ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ইউরোপ, আমেরিকা ও নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেট মিলিয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। সে হিসাবে দুই বা আড়াই শতাংশ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়।
তার মতে, গত অর্থবছরজুড়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে উদ্বেগ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি রপ্তানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন এক্সটেনশন হবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অনিশ্চয়তাও ছিল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ট্যারিফ অবস্থান অনুকূলে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কিছুটা সুবিধা পেয়েছে।
সামনে নতুন প্রতিযোগিতা
বিজিএমইএ সভাপতির মতে, আগামী দিনে ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে চীন ও ভারত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। পাশাপাশি ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কার্যকর হলে ভারত মূল্য সুবিধা পাবে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তিনি জ্বালানি সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, জ্বালানি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয়। এর পাশাপাশি ফাইন্যান্সিয়াল কস্ট কমাতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে এটি ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলে আশা করছি।
রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সিপিডি: প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক, কিন্তু গতি কমেছে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে প্রায় ৪ শতাংশে।
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপের কারণে আমদানির চাহিদা কিছুটা কমেছে। এর প্রভাব তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের ওপরও পড়েছে।
তিনি বলেন, পোশাক বহির্ভূত খাতের ভালো পারফরম্যান্স ইতিবাচক হলেও দীর্ঘমেয়াদে পণ্য বহুমুখীকরণ, উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সংলাপ জোরদার করার বিকল্প নেই।
যেসব খাতে উজ্জ্বল প্রবৃদ্ধি
ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের কয়েকটি নন-অ্যাপারেল খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
ফুটওয়্যার: রপ্তানি আয় ৩৮৬ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ৩০৭ মিলিয়ন ডলার); প্রবৃদ্ধি ২৬ শতাংশ।
প্লাস্টিক পণ্য: রপ্তানি ৩৫ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ১৪ মিলিয়ন ডলার); প্রবৃদ্ধি ১৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য: আয় ১৩১ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ৯০ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার); প্রবৃদ্ধি ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
টেক্সটাইল সামগ্রী (পোশাক ছাড়া): আয় ১৬৯ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ১৪৯ মিলিয়ন ডলার); প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
মাছ: আয় ৩০ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ২৫ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার); প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
যেসব খাতে রপ্তানি কমেছে
সব খাত অবশ্য ইতিবাচক ছিল না। কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি কমেছে।
হেডগিয়ার (টুপি ও মাথায় ব্যবহারের সামগ্রী): ২৩৬ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ২৫৮ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার); রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
ফার্নিচার: আয় ২০ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ২৫ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার); রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ।
ওষুধ: আয় ১৮ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলার (২০২৪-২৫: ১৮ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার); রপ্তানি সামান্য ১ শতাংশ কমেছে।
সামনে করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পণ্য বহুমুখীকরণে আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সংলাপ জোরদার, বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রপ্তানি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনও স্থিতিস্থাপক। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজার বহুমুখীকরণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।