বিশ্বকাপ ফুটবলে রেফারিং বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে একের পর এক ম্যাচে রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা আগের অনেক আসরকেও ছাড়িয়ে গেছে। খেলোয়াড়, কোচ, সমর্থক থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে এখন ম্যাচ পরিচালনা।
কানসাস সিটিতে বেস ক্যাম্পে ফেরার পর আর্জেন্টিনা দলের সামনে ছিল উৎসবের আবহ। শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয় উদ্যাপন করছিলেন সমর্থকেরা। তবে সেই ম্যাচের রেশ কাটেনি মিসর শিবিরে। তাদের অভিযোগ, দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফল পাল্টে দিয়েছে।
মিসরের দাবি, ৬২ মিনিটে মোস্তফা জিকোর গোল অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউলের অভিযোগও উপেক্ষা করেছেন ম্যাচ রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। ম্যাচ শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করে জিকো রেফারিকে ‘জালিম’ বলেও মন্তব্য করেন।
তবে রেফারিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্কিত দুটি ঘটনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জিকোর বাতিল হওয়া গোলের ঘটনায় ডিফেন্ডারের স্পষ্ট ফাউল ছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার গোলের আগে দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে যে সংস্পর্শ হয়, সেটি স্বাভাবিক খেলার অংশ বলেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁরা। তারপরও ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
শুধু আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বসনিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান লাল কার্ড দেখার পর ফিফা নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে তাঁর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। এরপরই আসে ফিফার সিদ্ধান্ত।
ঘটনাটি ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ফিফার নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচনার মুখে সংস্থাটিকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও দিতে হয়। এমন সিদ্ধান্তকে ‘সীমা অতিক্রম’ বলেও মন্তব্য করেছিল উয়েফা।
বিশেষ অনুমতি নিয়ে বালোগানকে খেলানোর পরও শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ টমাস টুখেলও। তাঁর মতে, অসংগতিপূর্ণ ও প্রত্যাশিত মানের নিচে থাকা রেফারিংয়ের কারণে যেকোনো দল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয় পেয়েও ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ওই ম্যাচে ইংল্যান্ডের জ্যারেল কোয়ানসা লাল কার্ড দেখেন।
টুর্নামেন্টের শুরুতেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসিকে কার্ড না দেখানো নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এরপর প্রায় প্রতিটি রাউন্ডেই কোনো না কোনো ম্যাচে রেফারিং নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ফ্রান্স-মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালে সম্পূর্ণ আর্জেন্টাইন ম্যাচ-অফিশিয়াল প্যানেল নিয়োগের সিদ্ধান্ত। ৪৪ বছর বয়সী ফাকুন্দো তেয়োর নেতৃত্বে একই দেশের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল এবারই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ পরিচালনা করবে।
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে এই নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও ফরাসি শিবির তেয়োর অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সমর্থক ফিফার এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেফারিং বিতর্কের নজির অনেক। ১৯৯০ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির পক্ষে বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্তের জন্য মেক্সিকান রেফারি এডগার্ডো কোডেসালকে কখনো ক্ষমা করতে পারেননি ডিয়েগো ম্যারাডোনা। আবার ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের পর ইংল্যান্ডের সমর্থকদের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসির।
ফুটবলে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক বরাবরই ছিল। তবে প্রযুক্তির যুগে ভিএআরের ব্যবহার সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করার কথা থাকলেও, সেটির প্রয়োগ নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। ফলে এবারের বিশ্বকাপে রেফারিং ও ভিএআর বিতর্কই অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসআর