টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে ভূমিধসের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। প্রশাসনের তথ্য সূত্র বলছে, এ পর্যন্ত আশ্রয়শিবিরের ১৯৩টি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে হাজারো রোহিঙ্গা বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিধসের ঝুঁকি থেকে জীবন রক্ষায় রোহিঙ্গাদের সচেতন ও সতর্ক করা হচ্ছে। এছাড়া ৪৮৯টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ক্যাম্প-৫-এর ইরানি পাহাড় এলাকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আবারও ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে একটি মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও সাতজন শিক্ষার্থী।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা।
নিহতরা হলেন—ব্লক-১১-এর বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩), ক্যাম্প-৩-এর আবদুস শুক্কুরের মেয়ে উম্মে সালমা (১২), ব্লক-৮-এর মোহাম্মদ ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩) এবং ক্যাম্প-৩ জি ব্লকের শামসুল আলমের মেয়ে শাহিদা (১৩)।
আহতদের মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া তিনজন হলেন—ক্যাম্প-৩-এর দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা (৯), নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) এবং ক্যাম্প-৫-এর বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)।
বাকি আহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের সময় খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করছিল। হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ভবনের ওপর পড়ে। এতে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী মাটিচাপা পড়ে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন নিজ উদ্যোগে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
উখিয়ায় দায়িত্বরত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, ক্যাম্প-৫-এর ইরানি পাহাড় এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে চার ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য একজন হাসপাতালে মারা যান।
এদিকে ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাহাড়ধসে একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসার ভেতরে শিশুরা অবস্থান করছিল। ঘটনার পরপরই রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য এবং ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম উদ্ধার ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে।
সম্ভাব্য হতাহতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আশপাশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এ নিয়ে গত তিন দিনে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন রোহিঙ্গা।
এর আগে সোমবার দিবাগত রাতে টানা বর্ষণের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। একই দিন দুপুরে পেকুয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে বসতঘরের দেয়াল চাপা পড়ে সাত বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। উখিয়ায় বসতঘরের দেয়াল চাপা পড়ে মারা যান আরও একজন। এসব ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন।
গত তিন দিনে রোহিঙ্গাসহ ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, গত রোববার থেকে বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৫০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে আশ্রয়শিবিরের বিভিন্ন পাহাড়ে ফাটল ধরে মাটিধসের ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, ‘সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের লার্নিং সেন্টার, বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্র এবং নারী ও শিশুদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ স্থান ব্যবহার করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে অর্থসংকটের কারণে অনেক লার্নিং সেন্টারের অবস্থা এখন আর আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী নেই।’
তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের আত্মীয়-স্বজনের ঘরবাড়ি এবং বিভিন্ন কমিউনিটি স্পেসে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে কিছু মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে এবং বৃষ্টির মধ্যেও সেই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫-এ ভূমিধস ও দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন জানিয়েছে, এরই মধ্যে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪৮৯টি রোহিঙ্গা পরিবারকে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ি ঢলের পানিতে উখিয়ার মধুরছড়া, বালুখালী, লম্বাশিয়া খাল ও ছড়া উপচে কয়েকটি আশ্রয়শিবিরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত ঘরবাড়ির রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার কাজ চলছে। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে জানান তিনি।
এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প-৯ থেকে ১৫ পর্যন্ত এলাকা সবচেয়ে বেশি ভূমিধস ও দুর্যোগঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ক্যাম্পে বসবাস করছেন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। পাহাড়ে অনিরাপদ বসবাসের কারণে প্রতি বর্ষাতেই ভূমিধস, প্রাণহানি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি ঘটছে। ফলে সবসময় চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন এসব রোহিঙ্গা।
ক্যাম্প-১০-এর সি ব্লকের বাসিন্দা দিলদার বেগম বলেন, ‘ক্যাম্পের জীবন খুব কষ্টের। কারণ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে প্রতিবছরই পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই আমরা খুবই ভয়ের মধ্যে আছি।’
ক্যাম্প-৪-এর বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ভয় লাগে। কারণ পাহাড় ধসে পড়ে। তাই রাতে জেগে থাকি।’
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে পড়ে। এটা প্রতিবছরই হয়। পাহাড়ের ওপর বসবাস করি, তাই সবসময় ভয়ে থাকি।’
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের ভারী বৃষ্টিপাতের সময় দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সতর্ক করা হচ্ছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি (কমিউনিটি নেতা) এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে। মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে টানা বা অতিভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে তারা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘সব ক্যাম্প ইনচার্জকে নিয়ে আমরা প্রস্তুতিমূলক সভা করেছি। আমাদের কাছে থাকা সব প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছেন। যেকোনো সময়, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় আমরা প্রস্তুত।’
জেলার ২০ হাজার পরিবার ঝুঁকিতে
কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শহরের লাইট হাউস, সৈকতপাড়া, সার্কিট হাউস এলাকা, মোহাজেরপাড়া, দক্ষিণ ঘোনারপাড়া, বাদশাঘোনা, বৈদ্যঘোনা, মধ্যম ঘোনারপাড়া, পাহাড়তলী, কলাতলী আদর্শগ্রাম, ঝরিঝরিকুয়া, সদর উপজেলা কার্যালয়সংলগ্ন এলাকা ও লিংকরোডসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হাজারো পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
একই চিত্র সদর উপজেলার পিএমখালী, খুরুশকুল, মহেশখালী, রামু, উখিয়া ও টেকনাফেও।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্প বাদ দিয়ে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ২০ হাজার পরিবার পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এর মধ্যে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাভুক্ত এলাকায় প্রায় ১৩ হাজার এবং উত্তর বন বিভাগের এলাকায় প্রায় সাত হাজার পরিবার রয়েছে।
কলাতলী বিট কর্মকর্তা ক্যাচিং মারমা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বনকর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনতে কাজ করেছেন। শত অনুরোধের পরও মানুষ পাহাড়ি এলাকা থেকে সরছেন না।
ভূমিধসের ঝুঁকিতে ১ লাখ রোহিঙ্গা
২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এসব শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে অন্তত এক লাখ মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢাল নরম হয়ে পড়ায় ক্যাম্পজুড়ে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
উখিয়ায় কর্মরত ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিংসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
পাহাড় দখল থামেনি
শত শত প্রাণহানির পরও পাহাড় দখল ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ থামেনি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার একর পাহাড় দখল করে প্রায় চার লাখ মানুষ বসবাস করছেন, যা জেলার মোট বনভূমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, ঘর নির্মাণের জন্য মাটি সংগ্রহ এবং জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বন উজাড়ের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে ভারী বর্ষণ হলেই ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, “পাহাড় কাটা ও বনভূমি দখল বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে নতুন বসতি গড়ে ওঠা রোধ করতে হবে এবং সবার সচেতনতা জরুরি। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।”
কক্সবাজার পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই মাইকিং, সতর্কবার্তা ও উদ্ধার তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় দখল রোধ, অবৈধ বসতি অপসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। প্রাণহানির পর নয়, বরং দুর্যোগের আগেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদ রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে জাতিসংঘ পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থা। পাহাড়ধসে নিহত স্থানীয় প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে সরকারি ভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
লাখো মানুষ পানিবন্দি, ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধ
ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দুই উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ফসলি জমি, চিংড়ির ঘের ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। একইভাবে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্লাবিত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আমনের বীজতলা, সবজিখেত এবং চিংড়ির ঘের পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় হাঁটুপানি জমে থাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
অপরদিকে, টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় দুই উপজেলার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মঈনুল আমিন বলেন, “তিন দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তাঘাটে হাঁটুপানি, চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”
মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের কৃষক সৈয়দ আলম বলেন, “আমনের বীজতলা ও সবজিখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফসলের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছি।”
চকরিয়া পৌরসভার রিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, “বৃষ্টির কারণে যাত্রী কমে গেছে। সারাদিন রিকশা চালিয়েও ঠিকমতো আয় হচ্ছে না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, “বেশ কিছু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, উজানের পানি দ্রুত ভাটিতে নামিয়ে দিতে উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানি নিষ্কাশনের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে।
বুধবার দুপুরে যোগাযোগ করা হলে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, কুতুবদিয়ায় ১ কিলোমিটার ৩০০ মিটার, ধলঘাটা-মাতারবাড়ীতে ৯৭০ মিটার এবং চকরিয়ায় ২ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এছাড়া মাতামুহুরী নদীর পানি ২০০ সেন্টিমিটারের ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
প্রস্তুত ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র, খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম
কক্সবাজারজুড়ে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে সড়ক যোগাযোগ এবং বন্ধ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা ও বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত শুকনো খাবারের চাহিদাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে এবং সব উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। ভারী বর্ষণ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”