সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশ একটি পুরানো এনজিও, যা ১৯৮৩ সালে শান্তি, ন্যায়বিচার ও ভালোবাসার স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশের আসল নাম ছিল চার্চ অফ বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (সিবিএসডিপি)। ২০১৬ সালে এই সিবিএসডিপির নাম পরিবর্তন করে সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশ রাখা হয় এবং এনজিও ব্যুরো রেজিস্ট্রেশন নম্বর হয় ১৫৫।
মানুষ জানতো যে সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশ একটি জনকল্যাণমূলক সংস্থা কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন, কারণ সেখানে ন্যায়বিচার, শান্তি ও ভালোবাসার অভাব রয়েছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশের বর্তমান কার্যকলাপ তা প্রমাণ করে না, কারণ সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে অবিচার, শান্তির বদলে আছে অশান্তি এবং ভালবাসার পরিবর্তে বিরাজ করছে ঘৃণা। তাদের বর্তমান কার্যকলাপ দেখে মানুষ হতাশ। এর কারণ হলো এই এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে দুর্নীতি ও কোর্টে মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদি।
২০১৫ সালে, দি লেপ্রোসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিএলএমআইবি) সমাজ থেকে কুষ্ঠরোগের মতো মারাত্মক রোগ নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সীমান্ত জেলা মেহেরপুরকে কুষ্ঠরোগের রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে কুষ্ঠরোগমুক্ত করার সরকারি লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের এই লক্ষ্যের প্রতি সাড়া দিয়ে টিএলএমআইবি এখানে সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ শুরু করে। কিন্তু সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশ পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে চরম দুর্নীতি এবং মামলা-মোকদ্দমার কারণে মেহেরপুর জেলায় কুষ্ঠরোগ সংক্রান্ত কার্যক্রম ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা যে টিএলএমআইবির মতো একটি ঝামেলাবিহীন ও সুপরিচিত সংস্থা সালোমের সাথে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
জানা গেছে যে, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে সালোমের অপকর্ম এবং আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলো দেখে দাতাসংস্থাটি মেহেরপুর থেকে সরে আসে। ফলস্বরূপ, দক্ষিণ-পশ্চিমের দশটি জেলার মধ্যে জেলাটিকে রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করা সত্ত্বেও জেলাবাসী টিএলএমআইবির মানবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সচেতন জনগণ টিএলএমআইবিকে অনুরোধ করেছেন, দুর্নীতিতে জড়িত বিতর্কিত ‘সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশ’ ছাড়া মেহেরপুর জেলায় কর্মরত অন্য কোনো বিশ্বস্ত এনজিওর মাধ্যমে কুষ্ঠরোগ কার্যক্রম পুনরায় চালু করার জন্য।
মেহেরপুর জেলাবাসী জানেন যে, টিএলএমআইবির কুষ্ঠরোগ কার্যক্রম থেকে জেলার তিনটি উপজেলার মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন। একই সঙ্গে, তারা মেহেরপুরের ‘সালোম, চার্চ অফ বাংলাদেশের ঋণ কার্যক্রমের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
উল্লেখ্য যে, এখন পর্যন্ত টিএলএমআইবি ‘সালোম’-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মোট ৭৮৬ জন রোগী শনাক্ত করেছে, যাদের সকলেই কুষ্ঠরোগ প্রকল্পের অপ্রতুল কর্মীদের কাছ থেকে প্রাণবন্ত সেবা পেয়ে সুস্থ জীবনযাপন করছেন। এই প্রতিবেদক ব্যক্তিগতভাবে এবং ‘সালোম’ কর্মীদের সঙ্গে অনেক কুষ্ঠরোগীর বাড়ী পরিদর্শন করেছেন এবং তাদের বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে জেনেছেন।
কুষ্ঠ মিশন তাদের অর্থায়নে মেহেরপুর জেলায় কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোট ৩৭টি স্কিন ক্যাম্প, ৪৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কুষ্ঠ রোগবিষয়ক পরিচিতিমূলক কার্যক্রম এবং ১২টি বিলবোর্ড স্থাপন করেছে। জেলায় তাদের কার্যকালে নতুন কুষ্ঠ রোগী শনাক্তকরণ ও তার প্রতিকার বিষয়ে মেহেরপুরের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করেছে। উপজেলা পর্যায়ে তাদের কার্যকালে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), স্বাস্থ্য সহকারী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিচিতিমূলক কার্যক্রম প্রদান করেছে।
এছাড়াও লিফলেট বিতরণ, ভিডিও প্রদর্শন এবং জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কুষ্ঠ দিবস উদযাপন করেছে। পাশাপাশি, কুষ্ঠ রোগীদের জন্য আয়বর্ধক কাজের ব্যবস্থা করা এবং তাদের বিভিন্ন সরকারি অধিকার প্রদানের জন্য তিনটি উপজেলায় কুষ্ঠ রোগী, কুষ্ঠ-আক্রান্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সাধারণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে মোট ২২টি স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং তিনটি ফেডারেশন গঠন করা হয়েছে, যেগুলো কুষ্ঠ-আক্রান্ত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
এই ফেডারেশনের উপকারভোগী সব সদস্য চাচ্ছেন যে টিএলএমআইবি তাঁদের কর্মকান্ড অন্য যেকোনো এনজিওর সঙ্গে অংশীদারিত্ব ভিত্তিতে অথবা তারা সরাসরি পরিচালনা করুক। সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের রোগী এবং ফেডারেশন নেত্রী হাদেছা খাতুন দাবি করেন টিএলএমআইবি মেহেরপুর জেলায় কাজ করুক আমরা উপকৃত হচ্ছি। মুজিবনগর উপজেলার বিশ্বনাথপুর গ্রামের শিশু রোগীর মা রিজিয়া খাতুন বলেন , আমার ছেলে জাহিদ কুষ্ঠ মিশনের সেবায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছে তাই আমরা চাই সংস্থাটি অন্য কোনো ঝামেলা মুক্ত সংস্থা বা নিজেরা আমাদের এখানে কাজ করুক।
তাছাড়া মেহেরপুর পশু হাসপাতাল পাড়ার বিশিষ্ট সমাজসেবক মশিউর রহমান খান, উন্নয়নকর্মী দিলারা পারভীন বলেন, জেলায় কুষ্ঠ মিশনের কাজ টিএলএমআইবি চলমান রাখুক।
৫-১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে রোগটি দেখা যাচ্ছে যদিও ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা কুষ্ঠে আক্রান্ত হয় না। মোট ৮২৯ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত করা হয়েছে এবং সকলেই সুস্থ জীবনযাপন করছেন।
জেলায় কুষ্ঠের সার্বিক অবস্থা জানতে এই প্রতিবেদক মেহেরপুরের 'সালোম চার্চ অফ বাংলাদেশের সভাপতি হেমেন হালদারকে বেশ কয়েকবার ফোন করেন, কিন্তু তিনি ফোন না ধরায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এম আর আলম/এসএ