জুলাই মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের বিদ্যমান মূল্যই বহাল থাকবে। সরকারের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এক মাসের জন্য দাম অপরিবর্তিত রাখা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মূল সমস্যার সমাধান নয়। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই এখনও আমদানিনির্ভর জ্বালানি-বিশেষ করে এলএনজি ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলেই তার প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, ভর্তুকি এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম. তামিম দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশীয় জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে না পারা। তাঁর মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ছাড়া আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। তিনি আরও মনে করেন, মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও সরকারের নীতিগত প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ নিজেদের হাতে। তাঁর মতে, বাজারে স্বচ্ছতা, দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, অপচয় কমানো এবং ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া শুধু মূল্য বৃদ্ধি বা মূল্য স্থির রাখার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। একই সঙ্গে তিনি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পূর্বানুমানযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম. শামসুল আলম বরাবরই বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। তাঁর মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং সক্ষমতার তুলনায় অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আর্থিক প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কেবল ভোক্তার ওপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দিলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে- বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ভর্তুকির চাপ কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ নয়। ফলে প্রতি মাসে জ্বালানির দাম নির্ধারণ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ী মহল বলছে, জুলাই মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকায় আপাতত পরিবহন ব্যয় বাড়ছে না। এতে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে আগামী মাসগুলোতে আবারও মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত হলো, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে টেকসই করতে হলে শুধু মাসভিত্তিক মূল্য সমন্বয় যথেষ্ট নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ, সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিতরণে সিস্টেম লস কমানো, চুক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন এবং জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।
অর্থাৎ, সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনলেও, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে কাঠামোগত সংস্কার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর।
-টিএস