ইতিহাসের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হলো কেপ ভার্দের। ১২০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে দারুণভাবে চ্যালেঞ্জ জানালেও অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলের হার নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে আফ্রিকার দলটিকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য ছিল আর্জেন্টিনার। তবে কেপ ভার্দের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগের সামনে শুরুতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। ১৫তম মিনিটে থিয়াগো আলমাদার পাস থেকে পাওয়া সুযোগ লক্ষ্যভ্রষ্ট করেন লিওনেল মেসি। তিন মিনিট পর ফ্রি-কিক থেকেও গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
অবশেষে ২৯তম মিনিটে জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দেন মেসি। লিসান্দ্রো মার্টিনেজের নিখুঁত লং পাস প্রথম স্পর্শেই নিয়ন্ত্রণে এনে কেপ ভার্দের দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে কাছের পোস্ট ঘেঁষে বল জালে পাঠান তিনি। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির সপ্তম গোল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার সরাসরি গোল অবদান দাঁড়ায় ১২টি (৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট), যা ১৯৬৬ সালের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কীর্তিও গড়েন তিনি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২০।
গোলের পরও আক্রমণের ধার বজায় রাখে আর্জেন্টিনা। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট দুর্দান্তভাবে প্রতিহত করে ব্যবধান আর বাড়তে দেননি। ১-০ ব্যবধানে এগিয়েই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। কেপ ভার্দে আরও সাহসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। ৫৪তম মিনিটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দুর্দান্ত এক সেভে দলকে রক্ষা করলেও ৫৯তম মিনিটে আর রক্ষা করতে পারেননি। রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাক থেকে ডেরয় দুয়ার্তে শক্তিশালী শটে বল জালে জড়িয়ে সমতা ফেরান।
গোল হজমের পর একের পর এক আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। ৬২তম মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজের পাস থেকে মেসির নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন ভোজিনহা। ৭২তম মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন তিনি। শেষ দিকে মেসি, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কয়েকটি ভালো সুযোগও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ায় নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১ সমতায়।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৯২তম মিনিটে কর্নার থেকে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ফ্লিকের পর লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বল নিয়ন্ত্রণ করে বাঁ পায়ের জোরালো শটে জালের ছাদে বল পাঠিয়ে স্কোরলাইন ২-১ করেন।
কিন্তু হাল ছাড়েনি কেপ ভার্দে। ১০৩তম মিনিটে সিডনি লোপেজ ক্যাবরাল বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে দূরের কোণায় দারুণ বাঁকানো শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে আবারও সমতা ফেরান। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার ছিল এই গোলটি।
ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ১১১তম মিনিটে আসে ভাগ্যনির্ধারণী মুহূর্ত। মেসির কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার ডিনে বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী এই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
শেষ মুহূর্তে কেপ ভার্দে আরেকবার সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল। ১১৬তম মিনিটে সিডনি ক্যাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সেটিই ছিল ম্যাচের শেষ বড় সুযোগ।
ম্যাচজুড়ে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ছিলেন অসাধারণ। তিনি আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে আর্জেন্টিনাকে বারবার হতাশ করেন। অন্যদিকে মেসি পাঁচটি শট লক্ষ্যে রাখলেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জয় নিশ্চিত হয় প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলে।
কঠিন লড়াই পেরিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিলেও এই ম্যাচে কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা আর শুধুই রূপকথার দল নয়; বরং যেকোনো পরাশক্তির জন্যই বড় হুমকি।