গাজায় চলমান যুদ্ধের হাজারতম দিনে উপত্যকার পরিস্থিতিকে ‘উন্মুক্ত কারাগার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিস্তৃত প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে উপত্যকায় ২ লাখ ২৩ হাজার টনের বেশি বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
গাজার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২১ হাজার ৫০০-এর বেশি শিশু এবং ১২ হাজার ৫০০-এর বেশি নারী রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৫৮ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশু এতিম হয়েছে এবং প্রায় ৯ হাজার ৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যাপক হামলায় গাজার বহু মানুষ আহত ও অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে হাজারো শিশুও রয়েছে।
এর পাশাপাশি ইসরায়েলি কারাগারে যৌন হেনস্থা ও ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ প্রকাশিত একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের শিকার ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। ইসরায়েলি কারাগারে দেশটির সেনা, কারারক্ষী, বসতি স্থাপনকারী ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের দ্বারা ব্যাপক যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
তাই কলামিস্ট ক্রিস্টফ লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আমাদের ভিন্নমত থাকলেও ধর্ষণের নিন্দায় আমাদের এক হওয়া উচিত। ইসরায়েলি নেতারা ধর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ না থাকলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এমন একটি ‘নিরাপত্তা কাঠামো’ তৈরি করেছে যার মাধ্যমে যৌন সহিংসতা ইসরায়েলের ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’-এর অংশে পরিণত হয়েছে।
গাজা সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৩৩ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এছাড়া ৫ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের অঙ্গহানি ঘটেছে। শারীরিক এ ক্ষতির শিকার হওয়াদের ১৮ শতাংশই শিশু।
গাজা সরকারের তথ্যমতে, যুদ্ধের কারণে ১ হাজার ৫০০ জন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১ হাজার ২০০ জন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। সংক্রামক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। এদের মধ্যে ৭১ হাজার ৩৩৮ জন ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত বলে দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসরায়েল ১ হাজার ৪৭টি মসজিদ সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে এবং আরও ২১০টি মসজিদ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এছাড়া তিনটি গির্জায় হামলা চালানো হয়েছে এবং ৩১২ জন ইমাম, খতিব, কোরান শিক্ষক ও অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
গাজা সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ৩৮টি হাসপাতাল, ৯৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স, ৮৪টি জরুরি সেবা যান এবং ১৬টি সিভিল ডিফেন্স কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে অথবা অচল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের ফলে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে শুধু আবাসন খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৩৪ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, ইসরায়েল ৩ লাখ ৩৫ হাজার ভবন ও আবাসিক ইউনিট সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে এবং আরও ৭ লাখ ৩৭ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর এই সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তা শেষ হয়। তবে, এরপরেও ৩৫০০ বারের বেশি যুদ্ধবিরিতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। এখনো প্রতিদিন বোমাবর্ষণ, অবরোধ আরও কঠোর করা এবং পর্যাপ্ত মানবিক, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে চলেছে।
এসআর