দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পলি জমে নাব্যতা হারানো ভোলার চরফ্যাশনের খালগুলো আবারও তাদের হারানো প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে। চরফ্যাশন উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে প্রায় ৯০ কিলোমিটার খাল খনন কার্যক্রম বর্তমানে জোরকদমে এগিয়ে চলছে। এতে খালের পানির প্রবাহ যেমন বাড়ছে, তেমনি কৃষকদের দীর্ঘদিনের সেচ সংকট ও বর্ষা মৌসুমের জলাবদ্ধতার ভোগান্তিও দূর হচ্ছে।
খালের এই পুনঃখনন করায় জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট দূর হওয়ায় ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন উপজেলার
২১টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষক। তারা নতুন করে ফসল আবাদের স্বপ্ন বুনছেন।
এই প্রেক্ষাপটে গত ২৭ মে চরফ্যাশন উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় বোয়ালখালি খাল ৩৭ দশমিক ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পুনঃখননের মাধ্যমে চরফ্যাশন উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ রুল ইসলাম।
খালগুলো পুনঃখনন করায় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার এওয়াজপুর, রসুলপুর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াখাল (এওয়াজপুর) মোরকখালী খাল (রসুলপুর), আইচার খাল (রসুলপুর) ও বয়াতির খাল’ (আমিরাবাদ) এবং চরফ্যাশনের মুখারবান্দা খাল, আসলামপুর ইউনিয়নের বোয়ালখালি খাল, আহম্মদপুর, ওসমানগঞ্জে দুটি খাল খনন করা হচ্ছে। একসময় এই খালে পলি জমে ভরাট হয়ে ছিল। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকটে বছরে শুধুমাত্র একটি ফসল উৎপাদন করেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো কৃষকদের। বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যেত চাষের জমি। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট হতো ক্ষেতের ফসল।
সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ২১ ইউনিয়নের বিএডিসির ১০ দশমিক ৩ কি. মি. স্থানীয় সরকার প্রকৌশলীর ৫১ কি. মি. পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় চরফ্যাশনের ৩ দশমিক ৫ কি. মি. এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় চরফ্যাশনের অধিনে ৩৭ দশমিক ১৩ কি. মি. খালের বেশির ভাগই এখন খননের আওতায় কাজ চলমান। খনন যন্ত্রের শব্দে এখন মুখর চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তর। বছরের পর বছর ধরে পলি জমার কারণে খালগুলো তাদের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের তীব্র সেচ সংকটে পড়তে হতো এবং বর্ষায় দেখা দিত চরম জলাবদ্ধতা।
আসলামপুর ইউনিয়নের বোয়ালখালি এলাকার কৃষক আবদুল কদ্দুছ বলেন, 'কিছু দিন আগেও এই খালগুলো ডোবা-নালার মতো ছিল। এতে গ্রামের লোকজন ময়লা আবর্জনা ফেলতো। এতে মশা, মাছির জন্ম হতো। এখন প্রকল্পের মাধ্যমে খালগুলো খনন করায় এলাকার লোকজন অনেক উপকৃত হবে।
এওয়াজপুর গ্রামের রুবেল, আব্বাস উদ্দিন ও মনির বলেন, আমরা সাধারণ কৃষক পানির অভাবে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত এবং খাল শুকিয়ে একেবারে চৌচির হয়ে যেত। শুধু বর্ষা মৌসুমে
একবার ধান চাষ করতাম। এখন খাল খননের ফলে একাধিক বার ধান চাষসহ নানা ধরনের ফসল ফলাতে পারব।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) প্রকৌশলী আরিফ হোসেন বলেন, 'প্রকল্প অনুযায়ী খালগুলো যথাযথ ভাবে পুনঃখনন করা হচ্ছে। যার ফলে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভবিষ্যতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের প্রকল্প অব্যাহত থাকবে।'
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল বলেন, 'উপজেলার অনেক এলাকায় গ্রীষ্মের সময় পানির অভাবে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ধান চাষসহ নানা ধরনের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতো। এখন খাল পুনঃখননের ফলে পানি সেচের সুবিধা ও জলাবদ্ধতা নিরসন হওয়ায় এক ফসলি জমিতে একাধিক বার ফসল উৎপাদন করতে পারেন কৃষকরা। ফলে এই এলাকার কৃষকরা আর্থিক ভাবে লাভবান হবেন।'
খাল খনন কার্যক্রমে যাতে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অনিয়ম না হয়, সে জন্য সার্বক্ষণিক মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা আফরোজ।
প্রশাসনের এমন তদারকি ও খাল খনন কার্যক্রমের ফলে স্থানীয় কৃষকদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি ফুটেছে।
এসএফ/এমএ