দেশে দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে মহিষ খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ এমপি।
মঙ্গলবার দুপুরে সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) আয়োজিত “মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালা” অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে মহিষ একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মহিষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উন্নত জাত সংরক্ষণ এবং খামারিদের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারলে দেশের দুধ ও মাংস উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।
উন্নত দেশসমূহে মহিষের দুধ একটি বড় উৎস। আমাদের দেশের চরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম কৃষিকাজ হয়। এখানে যদি আমরা লবণাক্ত মাটির জন্য উপযোগী লবণ-সহিষ্ণু জাতের ঘাস চাষ করতে পারি, তবে মহিষ পালনের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে কৃষিকাজের জন্য জায়গার স্বল্পতা দেখা দেবে। তাই কম জায়গায় কীভাবে মহিষ পালন করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এ ছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার গবেষণা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
মন্ত্রী এ সময় আরও বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল সম্প্রসারণের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। প্রতিটি জেলায় একটি করে খামার তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল পালনে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।
ছাগলের কৃত্রিম প্রজনন, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং দরিদ্র নারীদের বিনামূল্যে ছাগল উপহার দেওয়ার মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী সরকারগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এ প্রকল্প পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় ব্ল্যাক বেঙ্গল জাত এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমান সরকার যে কোনো মূল্যে ব্ল্যাক বেঙ্গলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস। আমরা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আবার ছড়িয়ে দিতে চাই।
আগামীতে গবেষণা খাতে আরও বেশি বরাদ্দ প্রদান করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, গবেষণা ছাড়া দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। গবেষণার বিষয়ে সরকার কোনো কৃপণতা করবে না। তবে প্রকৃত অর্থে গবেষণা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাই এখানে প্রকৃত গবেষণা হচ্ছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা ভবিষ্যতের জন্য কিছু করে যান। আপনাদের পূর্বপুরুষেরা ভালো কিছু করেছেন বলেই এখন আপনারা তার অনেক সুফল ভোগ করছেন। পাহারা দিয়ে গবেষণা করানো যাবে না, এটা আপনাদের ভেতর থেকেই আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম, গবেষণার ফলাফল, মহিষের জাত উন্নয়ন, প্রজনন প্রযুক্তি এবং খামার ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপস্থাপনা করা হয়। গবেষকরা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে মহিষ পালনে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং খামারিদের সক্ষমতা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
কর্মশালায় বক্তারা মহিষ খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া রাজশাহী থেকে কর্মশালায় অংশ নেওয়া মহিষের খামারিরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। এ সময় সরকারি কর্মকর্তা, খামারি ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মৌলিক গবেষণার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রকল্প থেকে যে সব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. শাকিলা ফারুক বলেন, আমাদের দেশে মহিষের সংখ্যা কম; মহিষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে যে সব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে, তা দেশের মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে।
আয়োজিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান প্রমুখ।
ওএফ/আরএন