‘আমার বাচ্চা হাম নিয়ে ভর্তি হইছে। হাসপাতালে কোনো বেড পাই নাই, এখন মেঝেতেই চিকিৎসা চলছে। খুব কষ্টে আছি।’ অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে পিরোজপুর ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের মেঝেতে বসে কথাগুলো বলছিলেন এক মা।
ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকায় ওয়ার্ড, বারান্দা ও মেঝে—সবখানেই রোগীর ভিড়। তবে সবচেয়ে সংকটজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে শিশু ওয়ার্ডে। মাত্র ১৪টি শয্যার বিপরীতে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সেখানে ভর্তি ছিল ৯১ জন শিশু, যা ধারণক্ষমতার ছয় গুণেরও বেশি। জ্যাকেটের মতো ঘেঁষাঘেঁষি করে নিচে অবস্থান করায় নিউমোনিয়া, হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
শুধু শিশু ওয়ার্ডই নয়; মহিলা ওয়ার্ডে ৩৬ শয্যার বিপরীতে ৮০ জন এবং পুরুষ ওয়ার্ডে ৩০ শয্যার বিপরীতে ৫৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। কাউখালী থেকে বিষাক্ত পোকার কামড়ে আসা ফরিদা বেগম বলেন, “উপজেলা হাসপাতাল থেকে সদর হাসপাতালে রেফার করছে। আইসা বেড পাই নাই। বেড পাইলে ভালো হইত, খুব কষ্ট হইতেছে।”
একদিকে রোগীর উপচে পড়া চাপ, অন্যদিকে প্রকট জনবল সংকট। জানা গেছে, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে ৬২ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১৪ থেকে ১৫ জন।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সুজিত পাইক বলেন, “বেড অনুযায়ী রোগী রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীও বাড়ছে। ডাক্তার ও স্টাফ সংকটের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।” সিনিয়র স্টাফ নার্স পপি হালদার জানান, অপ্রতুল জনবল নিয়েই তারা দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
রোগীদের এই দুর্বিষহ চিত্র দূর করতে ২০১৭ সালে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ভবনের মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ফার্নিচার ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাবে এখনো তা চালু হয়নি। তিন দফায় সময় পিছিয়েও উদ্বোধন করা যায়নি। সর্বশেষ গত ৩০ জুন লিফট ছাড়া চারটি ফ্লোরে চিকিৎসা চালুর সিদ্ধান্ত হলেও ফার্নিচারের অভাবে তা ভেস্তে যায়।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, ফার্নিচারের অভাবে ৩০ জুন চালু করা সম্ভব হয়নি এবং নতুন করে আর কোনো তারিখও নির্ধারণ করা হয়নি।
তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন ইতিবাচক বার্তা দিয়ে জানান, “আমরা লিফট ও সরঞ্জামের জন্য আর অপেক্ষা করছি না। আপাতত আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বর্তমান ভবন থেকে ইমারজেন্সি ও শিশু সার্ভিস নতুন ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে শিফট করা হবে।”
জনবল সংকটের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, চলতি মাস থেকে ধাপে ধাপে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল পদায়ন করা হবে।”
উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা পিরোজপুর সদর হাসপাতাল ২০০৫ সালে ১০০ শযয়ায় উন্নীত হয়। দ্রুত নতুন ভবন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে পিরোজপুরসহ আশপাশের প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এসএ