অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ‘সাংগ্রাই পোঃয়ে’ বা মৈত্রী বর্ষণ উৎসব। উৎসবকে ঘিরে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা রুমাজুড়ে এখন বইছে আনন্দের বন্যা। ‘সাংগ্রাই মা ঞিঞি ঞাঞা’ গানের সুরে মুখর হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জনপদ। প্রতিটি পাড়া, গ্রাম ও মানুষের মনে এখন একটাই অপেক্ষা—সাংগ্রাই উদযাপন।
উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ঘরে ঘরে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নতুন পোশাক তৈরি এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুতের ব্যস্ততা। তরুণ-তরুণীরা নাচ-গানের মহড়ায় সময় পার করছেন, আর বয়স্করা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সাংগ্রাই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো পানি খেলা বা জলকেলি। এই আয়োজনে একে অপরকে পানি ছিটিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এতে পুরোনো বছরের দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে যায় এবং নতুন বছর আসে নির্মল আনন্দের বার্তা নিয়ে।
মারমা সম্প্রদায়ের মতে, সাংগ্রাই এখন আর শুধু তাদের নিজস্ব উৎসব নয়; এটি বান্দরবানের সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এটি সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পাহাড়ের নীরব প্রকৃতির মাঝে সাংগ্রাই যেন এক রঙিন জাগরণ—পুরোনোকে বিদায় ও নতুনকে বরণ করার আনন্দঘন উপলক্ষ।
জানা গেছে, রুমা উপজেলায় আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হবে মৈত্রী বর্ষণ বা জলকেলি উৎসব, যা চলবে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত। এ সময় গ্রাম ও মহল্লায় রাতে পিঠা তৈরি, বয়স্কদের পূজা এবং প্রতিটি বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধ স্নানের আয়োজন করা হবে, যার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা হবে।
ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মৈত্রী বর্ষণের জন্য বাঁশের কঞ্চি দিয়ে নৌকা ও বিশেষ মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি আয়োজন করা হচ্ছে বর্ণিল শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
স্থানীয় বাজারগুলোতেও লেগেছে উৎসবের ছোঁয়া। জমে উঠেছে কেনাবেচা—হাতে তৈরি অলংকার, ঐতিহ্যবাহী থামি পোশাক ও বিভিন্ন হস্তশিল্পের চাহিদা বেড়েছে। বৌদ্ধ বিহারগুলোতে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আর সাঙ্গু নদীতে নারী-পুরুষ একসঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে কাপড় ধোয়ার আয়োজনেও অংশ নিচ্ছেন তরুণরা।
রুমা উপজেলার বটতলী পাড়ার বাসিন্দা নুমংসিং মারমা বলেন, “গত ছয় দিন ধরে নৌকা ও মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। মৈত্রী বর্ষণের আগেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করছি, এবার জাঁকজমকভাবে সাংগ্রাই উদযাপন করা হবে। আমাদের পাড়ায় ম্রো, খুমি, চাকমা, ত্রিপুরাসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে পানি খেলায় অংশ নিয়ে সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করবে।”
পলিকা পাড়া আয়োজন কমিটির সভাপতি ও ইউপি সদস্য মংমিন মারমা বলেন, “প্রতি বছরের মতো এবারও সাঙ্গু নদীর বালুচরে সাংগ্রাই মৈত্রী বর্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। বাঁশ দিয়ে নৌকা ও মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। উৎসবকে ঘিরে পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে।”
পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা জানান, “আমাদের চান্দা পাড়ায় সাংগ্রাই উপলক্ষে মৈত্রী বর্ষণ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। নাচ-গান, পানি খেলা, কনসার্ট, পিঠা উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাসহ নানা আয়োজন থাকছে। এ কারণে গ্রামবাসী এখন উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।”
দুর্গম পাহাড়ের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান এই উৎসবকে ঘিরে রুমার প্রতিটি গ্রামগঞ্জে এখন উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। সব বয়সের মানুষ নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্তুত—আনন্দ, ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির এক অপূর্ব বন্ধনে।
ইউএম/আরএন