সুনামগঞ্জে গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতে হাওরে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতায় কৃষকরা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। বুক ভরা কষ্ট নিয়েই তারা গবাদিপশুর জন্য কোমর পর্যন্ত পানিতে নেমে ধান কেটে নৌকায় তুলে আনছেন। চোখের সামনেই সারা বছরের খোরাকের স্বপ্নের ফসল নষ্ট হতে দেখে হাওরপাড়ের কৃষকরা মানতে পারছেন না।
বুধবার দুপুরে মধ্যনগর উপজেলার রংচী গ্রামের কৃষকদের টাঙ্গুয়ার হাওরে পানির নিচ থেকে কাঁচা ধান কেটে নৌকায় তোলার দৃশ্য দেখা যায়।
কৃষকরা অভিযোগ করছেন, হাওরে জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ অপরিপক্ব কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যে ধান কিছুদিন পর গোলায় উঠার কথা ছিল, সেই স্বপ্নের ফসল এখন পানির নিচে। তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান গরু ও ছাগলের খাবারের জন্য এখন পানির নিচ থেকে কেটে আনার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
এদিকে কেউ কেউ অপরিপক্ব কাঁচা ধান সিদ্ধ করে কিছুটা চাল পাওয়ার আশাও করছেন। কৃষকেরা মনে করছেন, এইভাবে যদি হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কৃষকের ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তারা সরকারকে অনুরোধ করেছেন, ভবিষ্যতে সঠিক পরিকল্পনা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং সুইস গেইট নির্মাণের মাধ্যমে হাওরে কৃষকের ফসল রক্ষা করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
উপজেলার চামরদানি গ্রামের কৃষক বাদল চন্দ্র সরকার বলেন, "হাওরের পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। বাইনছাপড়া হাওরের কাইতকান্দা এলাকায় একটি সুইস গেইট থাকলেও এটি অকার্যকর। তাই বাইনছাপড়া হাওরে বৃষ্টির পানিতে কৃষকের আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। গত পাঁচ দিন ধরে আমরা সেলু মেশিন দিয়ে হাওরের পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছি। কিছুদিন পরে যে ফসল ঘরে তোলার কথা ছিল, এখন তা গরুর খাবারে পরিণত হচ্ছে। এত কষ্টের ফসল পানিতে নষ্ট হচ্ছে। ধার-দেনা করে জমিতে ফসল লাগানোর পর অল্প বৃষ্টিতেই সব শেষ।"
তিনি আরও বলেন, "হাওরে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হচ্ছে। কৃষকদের ফসল রক্ষার চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে। বাঁধে কোনো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রেখেই কাজ করা হয়েছে। যদি সুইস গেইট সচল থাকতো, তাহলে বৃষ্টির পানি হাওরে জমে থাকতো না। কৃষকদের চোখে ঘুম নেই, আরেকটু বৃষ্টি হলে আরও ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাবে।"
উপজেলার রংচী গ্রামের কৃষক ও ইউপি সদস্য নুরুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, "টাঙ্গুয়ার হাওরে অনেক ধান পানির নিচে, কিছু জমিতে গলা সমান পানি। অল্প বৃষ্টি হলে সেগুলোও তলিয়ে যাবে। কৃষকের বাঁচার কোনো উপায় নেই। এভাবে আরও কয়েক দিন থাকলে সব শেষ হয়ে যাবে। কৃষকরা কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন গরুর জন্য। চোখের সামনে এই ফসল ডুবছে দেখে চুপ থাকা যায় না। মনের শান্তির জন্য কাঁচা ধান পানি থেকে কোলা হচ্ছে। যে ধান কাটা হচ্ছে, তা কিছুদিন পরে পরিপক্ব হয়ে যেত। কিন্তু বাধ্য হয়ে আধা কাঁচা ধান কাটতে হচ্ছে। এগুলো কিছুটা গরুর জন্য এবং কিছুটা নিজেদের ব্যবহারের জন্য বের করার চেষ্টা করা হবে।"
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এবছর জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও হাওর জলাবদ্ধতার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ফারুক আহমেদ জানান, "এবছর জেলার বিভিন্ন হাওরে অধিকাংশ কৃষকের ধান বৃষ্টির পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে ডুবে গেছে। এতে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে হাওরে ধান কাটার কাজ শুরু হবে। হাওরে এখন ধান পাকা শুরু হয়েছে।"
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, "হাওরে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষকের ধান পানিতে ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী মৌসুমে সার ও বীজ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া হাওরের কৃষকের ফসল রক্ষার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাঁধ নির্মাণে সুইস গেইটসহ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ না করে পানি নিষ্কাশন ও সুইস গেইট নির্মাণে কাজ করা হবে।"
আরএ/আরএন