Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশ      প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      

রাষ্ট্র সংস্কার: শেষ অধ্যায়ের প্রথম পাঠ

প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫৮ পিএম   (ভিজিট : ৪৪৮)
“তুমি যে এতো ক্লান্ত তা তোমাকে দেখে মনেই হয় না, আমি তো তোমার মস্ত জোরটাই দেখতে পাচ্ছি।”

“নন্দিন, একদিন, একদিন দূরদেশে আমারই মতো এক ক্লান্ত পাহাড়কে দেখতে পেলুম– বাইরে থেকে বুঝতেই পারিনি ভেতরে ভেতরে পাথরগুলো ব্যথিয়ে উঠেছে, একদিন গভীর রাতে ভীষণ শব্দ শুনলুম– যেন কোন দৈত্যের দুঃস্বপ্ন হঠাৎ গুমরে গুমরে ভেঙে গেল; সকাল বেলায় দেখি ভূমিকম্পের টানে পাহাড়টি মাটির নীচে তলিয়ে গেছে –শক্তির ভার নিজের অগোচরে নিজেকে কীভাবে পিষে ফেলে সেই পাহাড়টিকে দেখে তাই ভুলিনি।”

হ্যাঁ, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪’– রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের রাজা ও নন্দিনীর ডায়লগের  বাস্তব চিত্রায়ন। সত্য যে কল্পনার চেয়ে আগন্তুক হয়ে দেখা দেয় তার চমৎকার উদাহরণও বটে। জনগণের শক্তি চুরি ছিনতাই ডাকাতি করে রাজদরবারে কেন্দ্রীভূত করলে ভূমিকম্প হবেই, ভূমিধ্বসের নীচে রাজপ্রাসাদ তলিয়ে যাবেই – এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। তবুও রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রীয় বলয়ে যারা থাকে তারা বিষয়টি বেমালুম ভুলে গিয়ে উল্টো পথে হাঁটে।

অপরদিকে জীবনের গদ্যে দেখি –তৃষ্ণার্ত জীবন খরায় পুড়ে জিহ্বা ও ওষ্ঠ ভেজাতে চায়, ক্ষুধার্ত জীবন আগুন জ্বেলে পেটের আগুন নেভাতে চায়; সে আগুনে রাজার সিংহাসন পোড়ে, সাথে নির্দোষ প্রজারও! কষ্টটা এখানেই এসে বাড়ে বহুগুণ। আমার আঁতুড়ঘর, বসতঘর নিরাপদ রাখতে বানিয়েছি মানচিত্র দেয়াল রক্তের সাথে রক্ত জোড়া লাগিয়ে–একাত্তরে,দেশী-বিদেশী সকল শত্রুর আগ্রাসন ঠেকিয়ে। একদিকে যারা চায় নি আমার জন্ম, দীর্ঘ চুয়ান্ন বছর ধরে নেংটি ইঁদুরের মতো ফুটো করে যাচ্ছে আমার ভালোবাসার চাদর; অন্যদিকে আমারই ঘরে বেড়ে উঠেছে দানব, নিতে চায় এবং স্বভাব সুলভ পুরো মালিকানা নিয়ে মুছে ফেলতে চায়, অংশীজনের সকল সুকৃতি সৃজনশীল কর্ম– মুক্তির সংগ্রাম। 

ভেতর-বাহির দু'দিকেই আক্রান্ত হতে হতে এখন প্রায় নির্জীব আমি; এই সুযোগে বেনিয়া দালাল শকুনেরা বসেছে গ্রীনরুমে– ওদের নির্দেশমতো চলছে নাটক, যেমন চলে এসেছে আগেও এমনি করে। তবে এবারের নাটকটি বেশ জব্বর জমেছে– রাষ্ট্র  শুদ্ধিকরণের (সংস্কারের)নামে চমকের পর চমক ঢেলে চলছে শুধুই কালক্ষেপণ, মেকআপ নিচ্ছে নট-নটী, হাজারো দর্শক-জনতা শীঘ্রই দেখবে করুণ নাট্যপালা।

আবারও একই সমস্যা– খোলাসা করে বলে না কেউ, কোথায় কী হচ্ছে কখন; বলা কি এতই সহজ? মহারাজ যখন চান ধূসর আকাশ–সূর্যও মেনে চলে মন দেয় অন্য কাজে। মহাকাশের তারাদের মেলায় ওর বিচরণ নিয়মিত– ও জানে বাংলাদেশের তারারা নিভে গেছে নিজেদের দোষে, নতুন গজাতে লাগবে সহস্র বছর।

কেউ কেউ তো এগিয়ে আরো দু'ধাপ– দোআ আর হাদিয়ার অপূর্ব মিলমিশ-এ অন্যরকম কালো দিয়ে লেপ্টে দিয়ছে আকাশ, উত্তরের তারকা নিয়ে গেছে দক্ষিণে; ওদের কম্পাস সবসময় বলে দিবে ভুল পথ, ভুল ঠিকানায় নিয়ে যাবে আমাদের; যন্ত্রণাকষ্টকাল সইতে হবে দীর্ঘ সময় ধরে পূর্বপুরুষদের মতো করে।

একজন শ্রদ্ধাভাজন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সম্প্রতি বললেন, ‘সংস্কার কমিশনের সংস্কার প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন।’ খুবই মূল্যবান কথা, যদিও তিনি রাজনীতির সংস্কার বিষয়ে রা শব্দটিও উচ্চারণ করলেন না; করবেনই বা কেন? রাষ্ট্র সংস্কারের কুশলীবগণই এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। আমি মনে করি, আমার মতো আছেন যারা ভালোবাসেন বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব বেঁচে থাকুক যুগযুগান্তর, তারাও নিশ্চয়ই একমত  হবেন উনার (রাজনীতিবিদের) কথায়– রাষ্ট্র আমার, ভালোবাসা আমার, মানচিত্র-পতাকা আমার, অথচ আমরা জনগণ নেই শুদ্ধি প্রক্রিয়ার কোন স্থানে, আমাদের নেই কোন ঠাঁই। এ যেন আসমান ফুঁড়ে নেমে এসেছে দেবতাসকল – মহৌষধ দিবে সর্বরোগহর। উনারা লোক দেখানো বহু সেমিনার ওয়ার্কশপ করলেন অফলাইন-অনলাইনে  নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি জাহির করলেন, বাইরে নিরাপত্তা বলয় হিসেবে রইলো ‘মব কালচার' – সমাজ-রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নগ্ন পরিহাস; অত্যাধুনিক অভিন্নতা স্থাপন প্রক্রিয়ার কথা বলে ঘাম ঝরালেন, দেখলাম আমারও–বেলাশেষে ‘অশ্বডিম্বের’ গল্প শুনে থিতু হলাম; আসলেই অন্তরালে কী হচ্ছে জানা নেই আমাদের; দর্শক-জনতা আমরা পিছনের সারিতে বসে আছি অধীর অপেক্ষায়– রাজা রানির পাঠ আনেন সহসা। 

আপনারা যে যাই বলেন, রাজা রানি ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নাই; গল্পে শুনেছেন, কাহিনী পড়ে চোখের জলে অথবা আনন্দে ভেসেছেন, সে আমার বিবেচ্য বিষয় নয়–আমি চাই আমার নিরাপদ বসত-আশ্রয়। ব্যক্তিগত কাঠামো ঘর গড়েছি নিজেই, এখানে আপনাদের হাত দেওয়ার দরকার নেই। ঝড়ের তান্ডব, কালে-অকালে বন্যা খরা, যারা তছনছ করে দেয় আমাদের স্বপ্ন-আয়োজন, অথচ আপনাদের ক্ষেত্রে তা স্বপ্ন-বিলাস। আপনারা যারা দিবারাত্রি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, অবশ্য ঘাম ঝরে না, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে চালাচ্ছেন শব্দ বাক্যের বাহাস– ওতে আমার কোন লাভ নেই, তবে লোকসান আছে প্রচুর; মৌসুম চলে গেলে বীজ বুনে কোন লাভ নেই–আমরা জানি, আপনাদেরও জানা আছে নিশ্চয়, নিস্ফলা বীজ কে বা কারা চায়! আপনারা না বললেও আমরা প্রজারা বুঝি – কোন মেঘে বাদল ঝরে, কোন মেঘ ঘটায় বজ্রপাত! 

এবার আসল কথায় আসা যাক– আছেন যারা শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক, কপাল পোড়া গণমাধ্যম গণসংস্থা বিশেষজ্ঞজন, বিদগ্ধ অথবা মাখন খাওয়া আমলারও আছেন কিচেন রুমে, কত যে পুষ্টিবিদ বানালেন রেসিপি – সুস্থ সবল দামড়া বানাবেন আমাদের জন্মভূমি; শুনতে বেশ ভালোই লাগে– ভূগোলজুড়ে আমরা চষে বেড়াব, চারণভূমিসব থাকবে আমাদের পুরো দখলে– যখন যেভাবে ইচ্ছে সাজাবো মানচিত্র। খুবই ভালো কথা, উতকৃষ্ট দামীও বটে। মানচিত্র বদলাতে চান, বদলান–তবে ঝগড়ায় মেতে ছোট না নিয়েন ভাই। অবশ্য, মানা না মানার, দরকষাকষি করার কোন অধিকার-কর্তব্য নেই আপনাদের, যারা ট্যাবে বা কম্পিউটারে আসমানী আদেশ কপি-পেস্ট করেছেন; লুঙ্গি বা আলখাল্লার নীচে যাই লিখে রেখেছেন অথবা লিখছেন রচনা গল্প কবিতা– সবই একদিন হাজির করতে হবে জনতার কাছে। 

অবশ্য, আপনাদের জ্ঞান ভান্ডার বিদেশী কবিরাজের ঔষধ পথ্য বিবরণে ঠাসা– নেই শুধু ভূমিজাত বাতাস, মাটির গন্ধ। আমাদের মনে হয় আপনারা নিজেরাও জানেন এটা– ফাপা, শূন্য বেলুন বাতাসে উড়বে সামান্য ক্ষণ, তারপরই হবে ভূপাতিত, চুপসে যাওয়া লাল মেরুন সবুজ হলুদ নানা রং–মৃত জীবন! এগুলোরও মাণিক্য সমান মূল্য আছে, যদি পাওয়া যায় সঠিক মহাজন। 

খুচরা পাইকার থেকে শুরু করে বড় বড় মহাজনের বেচাকেনার কতো কারবার দেখলাম এই দীর্ঘ সময়– গত চুয়ান্ন বছর; একাত্তরে কেউ জীবনের দর-দাম করেনি, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী ঘাতক-দালাল বাদে। অমূল্য প্রতিটি  জীবন, সমস্ত যন্ত্রণা জোড়া লাগিয়ে গড়েছি বাংলাদেশের মানচিত্র – লালসবুজ পতাকা আমাদের নিজেদের অর্জন, অহংকার করি না–এটা সত্য যে, এর একচুল অমর্যাদাও সহ্য করবো না আমরা আমাদের সংগ্রামের গৌরব। অতীব কষ্টের বিষয় যে, বাস্তব চিত্র যা দেখছি, যা দেখে আসছি দশকাধিককাল ধরে, বড় বেশি যন্ত্রণা কষ্ট দেয়–আমাদের চোখ-নাক-কান সবসময় ডুবে থাকে যন্ত্রণাক্লিষ্ট হাওয়ার চাদর মুড়ি দিয়ে। আমরা জানি – এ চাদর আমাদের জীবনের জন্য নয়; যারা এটা আমদানি করেছে, ভিন্ন লোকের দখলে সম্ভ্রম দিয়েছে তারাই দায়ী আমাদের এ দুর্দশার জন্য। 

আমরা জনগণ, যারা আসলেই হয়েছি কাল্পনিক অস্তিত্ব,অংকের ফল মেলানোর জন্য ধরে নেওয়া কিংবা হাতে রাখা কাল্পনিক রাশি, বড় সংকটে আছি রক্তমাংসের জীবন নিয়ে।  জীবন এমনই এক অস্তিত্ব যে, চিমটি কাটলে উহ্ আহ্ করে, আবার পুড়িয়ে মারলেও রা শব্দ করে না; বড় আশ্চর্য হই– ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রচণ্ড অনুভূতিপ্রবণ, কিন্তু সামষ্টিক পর্যায়ে সর্বংসহা শামুক ঝিনুক কিংবা গণ্ডারের চামড়া যেন। 

এতসব কথাকাব্য ছেড়ে বাস্তবের গদ্যে বলা যায়, আমাদের জনগণের আশা আকাঙ্খা নয়, বিদেশি বন্ধু-সুহৃদ এর গভীর ভালোবাসা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে দেখে আসছি – শুদ্ধি শুদ্ধি, মেরামত মেরামত খেলা, ছোটবেলাকার বালু দিয়ে ঘরবাড়ি-পুতুল বানানোর মতো করে। হ্যাঁ, ছোট বড় মাঝারি প্রভুরা আমাদের দিয়ে খেলিয়ে নিজেদের ব্যবসার লাভ লোকসান হিসাব কষে গেঁড়ে বসে কিংবা চলে যায় সাময়িক; আবার ফিরে আসে, আসা-যাওয়ার নিয়ম মেনে ঔপনিবেশিক জাহাজ ভিড়ে চেনা পুরাতন বন্দরে। 

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী সরকার শুধু  নির্বাচন অনুষ্ঠানকে প্রহসনেই পরিণত করে নি, দুঃশাসনকেও করেছিল পাকাপোক্ত। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম চাওয়া ছিল –এ দুঃশাসন থেকে বেরিয়ে এসে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীর দানবীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিবে এবং তা গণনায় নিয়ে সঠিক ফলাফল নিশ্চিত হবে; নির্বাচিত সরকার বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু, সে পথে না হেঁটে কেউ এসে নির্বাচন অনুষ্ঠানকে প্রহসনের নাটক থেকে উত্তরণ ঘটাবে এমন আশা বোকা জনতাও করে না আর– তারা এখন শুনতে পায় তারাপদ রায়ের ‘দারিদ্র রেখা’ কবিতার করুণ সুর।

প্রসঙ্গক্রমে আমরা এটাও জানি যে, প্রভুদের সমরাস্ত্র ব্যবসা সবসময় ঊর্ধমুখী–দেশীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ব্যবসার বৃহত্তর বৃত্তে ওদের কালো অংশের বিস্তার বাড়ছে তো বাড়ছেই; বাড়ুক, বড় হোক আরো আরো–ওদের  চাওয়া এটাই। আমরাই বা কম কীসে? সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে বহু মানুষের হাহাকার বাড়ছে দিন দিন; যারা ছিলেন বৃত্তের ভেতরে তারাও বৈষম্যঢেউয়ের আঘাতে ছিটকে পড়লেন বাইরে। এখন কী করবো আমরা? সিলেবাসের বাইরেই শুধু নয়, বিপথে পরিচালিত করার সবগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করলেন উনারা দীর্ঘ সময় – সমস্ত পাণ্ডিত্যের অর্জন, এত বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, জ্ঞানগর্ভ বিচরণ-রেখা,সমৃদ্ধ নেটওয়ার্ক সবই কী বিফলে যাবে? অবশ্যই না, যায়নি কখনও, যা করার ছিল করা হল তা–দেশকে পিছিয়ে দেওয়া হল অতীতের মতো আরও কয়েক দশক!

বড় চালাক প্রভু-বন্ধু আমার! ষাট সত্তর দশকের দাবার ঘুঁটি ফেললেন আবারও, চাল দিয়ে তাকিয়ে রইলেন – কেউ করে না নড়নচড়ন, সবাই কচুর লতা, মরা ডালে বাসা বাঁধে কালের কোকিল। কুহু কুহু ডাকের সুরে বসন্ত নেই – কবি মোহাম্মদ রফিকের ‘খোলা কবিতা’র ভাষায়, ‘নেতানো নুনু’। আসলেই তাই, বেলাশেষে সবাই অপেক্ষা করে– নেমে আসুক গভীর আঁধার; সব পাপের আয়োজন ডালা ভরে সোপর্দ করবে কুহকী শক্তির বেদীমূলে– ফুলে ফুলে ভরে উঠবে পূজা মণ্ডপ, ধূপ-ধুনার সুগন্ধি,আতরের সুবাস বাতাস কেবলই ওড়াবে ভালোবাসা, সুতীব্র গন্ধমাখা সময় জুড়ে থাকবে মহাজীবনের আখ্যান। সামষ্টিক সংস্কারের ব্যর্থ প্রয়াস– ব্যক্তির কূটকৌশল চালের সুন্দর নৈবদ্য ঝর্ণার কূল কূল ধ্বনি, সুমধুর সুর কেবলই বলবে – বাস্তবে নয়, তোমরা মেতেছিলে কল্পনায় বহুদূর; ভূতের ছায়াসাথী তোমরা সবাই কোরাসে গাইলে– পঞ্চভূতের খেমটা নাচের বাহাদুরি। 

এতসব নাট্যাভিনয় দেখার পাশাপাশি আবারও পড়ছি প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক  ফয়েজ আহমেদ এর সাড়া জাগানো বই–‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’। বই পড়ার আনন্দের সাথে বাড়তি পেলাম রাজনীতির ব্যাকরণ জ্ঞান – পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকেও ছিল যে খেলা, এখনও চলছে তা ; পার্থক্য শুধু খেলোয়াড়ের পরিবর্তন – জনগণের ভাগ্য তথৈবচ! 

বাস্তব যে কল্পনাকেও হার মানায়– দেখলাম তা মাত্র কিছুদিন আগে; মহা আড়ম্বরে ঢোল পিটিয়ে অভিন্নতা আয়োগ (অনুসন্ধান-সমিতি) প্রসব করলো অনৈক্যের ক্যাকটাস– বিভাজনের যন্ত্রণা-বিষবৃক্ষ রোপণ করা হ'ল খোলা মাঠে নদীর পাড়ে। বৃটিশকেও হার মানায় আমাদের বেনিয়া, বলেছিলাম পলাতক স্বৈরশাসন আমলে লেখা–‘স্বাধীন বাংলাদেশের মালিকানা ফেরত চাই’ কবিতায়; রাষ্ট্র শুদ্ধিকরণের নামে পর্দার আড়ালের খেলা বহুদূর–পুরো বছর মাস দিন পার করে রোপণ করা হল বিভাজনের বটবৃক্ষ! যা বড় হয়ে, এ মহীরুহের ডালপালা পাতা ঝুরি শিকড় সবাই মিলে, গিলে খাবে আমাদের সুন্দর সব অবয়ব-অন্তর। 

এ কথাগুলো কেন বলছি তা সকলেই জানেন; তবুও আবার বলি–প্রস্তাবনা অংশে (ইন্নি আম’ল বিন নিয়’ত, অর্থাৎ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে কর্মের ফল) মুক্তির সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত বয়ান বানাতে গিয়ে ভুলিয়ে দেওয়া হ’ল পাক-হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা, সহযোগী রাজাকার আলবদররা তো চব্বিশের চন্দ্রসন্তান হওয়ার সুযোগ নিয়ে মুছে ফেলতে চায় একাত্তরের সূর্য। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবেযুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হ’ল; সেই সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা ও মহান মুক্তিযুদ্ধকে এমনভাবে বিবৃত করা হলো, যেন হঠাৎ বেল গাছ থেকে টুপ করে খসে পড়ল আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ– হায়রে অভিন্নতা আয়োগের ব্রাহ্মণ্য ব্যাকরণ! শুধু কী তাই? রাষ্ট্র কাঠামোর মূলনীতিসহ জন্মকে প্রশ্নিদ্ধ করে, সবগুলো খুঁটি নড়বড়ে করে মেরামতের  দীর্ঘ ফিরিস্তির টেবিলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’সমেত যে ঐক্যদলিল হাজির করা হল তাতে গণপছন্দের  ঐক্যবিন্দু আর কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। 

তবে আশার কথা এই– জনগণ যারা সাহস ও শক্তি নিয়ে দুই হাজার চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই  মুনাফেকি কর্মকাণ্ডের নগ্ন উল্লাস দেখে মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছলেন নিভৃতে, ‘বান্দরওয়ালাদের ভানুমতী খেলায়’ তাল দিলেন না কেউ; রইলেন তাঁরা নিশ্চুপ,যেমন ছিলেন শাসনকালের বিভিন্ন পর্বে –সময়মতো ঠিকই ঘটিয়েছিলেন বিস্ফোরণ! ঘটাবে আবারও, অংক কষে বলা যায় নিশ্চিত। জন্মের সাথে, জন্মভূমির সাথে,ওঁর বেড়ে ওঠা বাঁক নেয়া ভালোবাসার সাথে প্রতারণা যে যখন যেভাবেই করুক কেন– টিকবে না ওদের কৃত্রিম স্বপ্ন-সন্তান-প্রেমিক যে যাই বলেন। 

জুলাই-আগষ্টের গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে অধিকার বঞ্চিত ও চরম বৈষম্যের শিকার বাংলাদেশের সাহসী প্রেমিক সকল স্বাধীনতাকামী জনগণ–অগ্রে ছিলেন আমাদের সন্তানগণ, সামিল ছিলাম আমরাও। অবশ্য, বারূদস্তুপের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সুযোগসন্ধানী কেউ কেউ দেশলাইয়ের কাঠি ঘষে আগুন জ্বেলে খেলতেই পারে ‘সুপরিকল্পিত’ খেলা। ওতে ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই আমাদের – আমরা চাই আমাদের বাংলাদেশ চলবে আমাদের জন্মগন্ধকে নিশানা করে।  বাহাত্তর থেকে ঝড়ঝাপটা, চড়াই উৎরাই সময় পার করিনি যে কম! দৈত্যদানবরাও করেনি ভুল – ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারবার’; বারবার তা ফিরয়েছিও বুকের রক্ত ঢেলে। তবে এবারের মতো সুপরিকল্পিত ছকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিকল করার এমন কার্যকলাপ আসেনি কোন পর্বে। তাহলে কি ভুল ছিল আমাদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা? ইতিহাস কি ছিল ভুলে ভরা? যা জানি, যা পড়েছি, যা লিখেছি এতকাল! আসলে না– নিজের ভেতর ক্ষয়রোগের বাসা বাঁধিয়ে অপরকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই ; দোষ দেই বা না দেই– সেটা অভ্যন্তরীণ ব্যাপার,কিন্তু ঘটনা যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে– বিভাজনের ফাটল ছিল যা সাতচল্লিশে, বহু রক্তের ফোঁটা জোড়া দিয়ে বন্ধ করলাম, ঝালাই করলাম যাকে একাত্তরে–সে আবারও ফেটে গেল! বেড়িয়ে আসলো সব সিন্দাবাদের দৈত্য-দানব। অবশ্য, আমাদের রাজনীতির যা অবস্থা–শত্রু শত্রু খেলা চলে আসছে দীর্ঘকাল, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। 

অধিকন্তু, ভেতরে বাইরে অনেকেই আছে, যারা চায়নি আমার জন্ম কোন কালে– তারাই নিয়েছে ভার আমার অসুখ সারিবার! এর চেয়ে নির্মম ট্রাজেডি মহাভারতে কিংবা শেক্সপিয়ারের নাটকেও হয়নি লেখা। দেহের অসুখ সারবার নাম করে মনে গেঁথে দিল এমন বিষবৃক্ষ, যা হাজার বছরেও দেখা দেয় নি কখনও।  তবে সত্য সাহস নিয়ে বুকে দু’হাত রেখে বলি– মুক্তির নিরন্তর সংগ্রামে আমরা ভয় পাই না–বেঁধে রাখি সময় হৃদয়ের গহীনে–সাহসে ভর করে চলি প্রগতির পথে; কিন্তু, একটাই খেদ রয়ে গেল মনে– এক সাগর রক্ত পারি দিয়ে আবারও শুরু হলো শূন্য থেকে প্রথম পাঠ!!

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক 





LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close