তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চেক সংক্রান্ত মামলা বর্তমানে আদালতগুলোতে একটি পরিচিত চিত্র। বিশেষ করে যৌতুক বা দেনমোহর নিয়ে বিরোধের জেরে অনেক সময় স্ত্রীর পরিবার স্বামীর চেক ব্যবহার করে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা করে থাকে।
কিন্তু এনআই অ্যাক্ট-এর ১৩৮ ধারার মামলার প্রধান শর্ত হলো চেকটি কোনো 'আইনী বাধ্যবাধকতা' বা দায়দেনার বিপরীতে প্রদান করতে হবে। যদি এটি প্রমাণিত হয় যে চেকটি চুরি হয়েছে এবং এ বিষয়ে মামলার আগেই থানায় জিডি বা কোনো আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে মামলার মেরিট দুর্বল হয়ে যাবে। কারণ তালাকের পর চেক মামলা করলে আদালত খতিয়ে দেখেন যে, তালাকের আগে ওই পরিমাণ টাকার কোনো লেনদেন বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল কি-না। কোনো কারণ ছাড়া বিশাল অংকের টাকার চেক প্রদান করা অস্বাভাবিক হিসেবে গণ্য হয়।
বিভিন্ন মামলায় উচ্চ আদালত বলেছেন, কেবল চেকে স্বাক্ষর থাকলেই দণ্ড হবে না, বরং সেই টাকা পাওনা থাকার যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। যদি আসামি প্রমাণ করতে পারেন যে চেকটি কোনো বৈধ দায় দেনার বিপরীতে দেওয়া হয়নি (যেমন: পারিবারিক বিরোধের জেরে অপব্যবহার), তবে ১৩৮ ধারার অভিযোগ টিকবে না।
আর চেকটি যদি সিকিউরিটি হিসেবে বা অন্য কোনো ভাবে হস্তগত করা হয় এবং পরে তাতে ইচ্ছামতো অংক বসিয়ে মামলা করা হয়, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এ জাতীয় মামলায় আদালত সাধারণত দেখেন যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোটি বা লক্ষ টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন হওয়া স্বাভাবিক কি-না। যদি কোনো দলিলাদি ছাড়া কেবল চেক দিয়ে মামলা করা হয়, তবে আসামি পক্ষ থেকে সত্যতা খন্ডনের সুযোগ থাকে।
এ জাতীয় মামলা থেকে অব্যাহতির কৌশল হিসেবে চেকটি হারানোর বা চুরি হওয়ার পর যদি কোনো জিডি করা থাকে, তবে তা আদালতে দাখিল করতে হবে। যদি চেকে স্বাক্ষর এক সময়ের এবং টাকার অংক বা তারিখ অন্য সময়ের কালিতে লেখা হয়, তবে তা ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন করা যায়। বাদীর (স্ত্রীর পরিবার) ওই পরিমাণ টাকা ঋণ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল কি না, তা নিয়ে জেরা করা। যদি প্রমাণিত হয় যে চেকটি চুরি করা এবং কোনো বৈধ লেনদেন ছিল না, তবে আদালত আসামিকে খালাস প্রদান করতে পারে। আর আদালতের কাছে যদি মনে হয় বাদী মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে, তাহলে মিথ্যা মামলার জন্য দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলার সুযোগ থাকে।
এছাড়া, তালাকের কারণে প্রতিশোধমূলক মামলা হিসেবে প্রমাণিত হলে চার্জ গঠনের সময় আসামীকে অব্যাহতি দিতে পারেন। অব্যাহতি না পেলে হাইকোর্টে বা উচ্চ আদালতে কোয়াশমেন্ট বা মামলা বাতিলের আবেদন করা যায়।
এছাড়া, স্ত্রী কিংবা স্ত্রীর পরিবারের কেউ যদি আপনার চেক চুরি করে বা অন্য কোনো উপায়ে হস্তগত করে তালাকের পর মিথ্যা মামলা দায়ের করে, তবে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আপনি পাল্টা কিছু আইনী পদক্ষেপ নিতে পারেন। যেমন- চেক চুরি এবং এর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আপনি সরাসরি আমলী আদালতে বা থানায় মামলা করতে পারেন। যদি চেকটি আপনার ঘর বা ড্রয়ার থেকে চুরি হয়ে থাকে, তবে দণ্ডবিধির ৩৮০ ধারায় চুরির মামলা করা যায়।
আর যদি চেকটি আগে কোনো কারণে বিশ্বাস করে দেওয়া হয়ে থাকে এবং এখন তার অপব্যবহার করা হয়, তবে দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় বিশ্বাস ভঙ্গের মামলা করা যায়।
যদি চেকে আপনার স্বাক্ষর জাল করা হয় কিংবা আপনি স্বাক্ষর করার পর তারা টাকার অংক বা তারিখ জালিয়াতি করে বসিয়ে নেয়, তবে দণ্ডবিধির ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারায় জালিয়াতির মামলা করা সবচেয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ। এছাড়া অসাধু ভাবে আপনার সম্পদ (চেক) আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে প্রতারণার আশ্রয় নিলে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় ধারায় মামলা করা যায়।
আপনি চাইলে দেওয়ানী আদালতে একটি 'ঘোষণামূলক মামলা' করতে পারেন। মামলায় উল্লেখ করতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট চেকটি কোনো বৈধ লেনদেনের বিপরীতে দেওয়া হয়নি এবং এর মাধ্যমে কোনো টাকা পাওনা হওয়ার সুযোগ নেই। আদালত থেকে চেকটির কার্যকারিতা বাতিলের ডিক্রি চাওয়া যায়।
কাজেই মামলায় জেতার জন্য এবং নিজেকে বাঁচাতে চেকটি চুরি হওয়ার সাথে সাথে থানায় জিডি, ব্যাংক স্টপ পেমেন্ট করতে হবে। এরপর মামলার সাক্ষী পর্যায়ে আপনার আইনজীবীর মাধ্যমে বাদীকে জেরা করতে হবে যে, তারা এত টাকা কোথায় পেল এবং কেন আপনাকে সেই টাকা ধার দিয়েছিল। টাকার উৎস দেখাতে না পারলে মামলা টিকবে না।
মো. আলতাফ হোসেন বনাম রাষ্ট্র ৭১ ডিএলআর (২০১৯) হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলায় বলেছেন যে, বাদী যদি দাবি করেন তিনি বড় অঙ্কের টাকা ধার দিয়েছেন, তবে তাকে অবশ্যই তার আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। যদি বাদীর আয়ের কোনো বৈধ উৎস না থাকে বা তিনি যদি প্রমাণ করতে না পারেন যে ওই পরিমাণ টাকা তার কাছে গচ্ছিত ছিল, তবে বিবাদী খালাস পেতে পারেন।
কিষাণ রাও বনাম শংকরগৌড়া [২০১৮ (৮) এসসিসি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট] বলেছেন, যদি বিবাদী বাদীর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলেন, তবে বাদীকে অবশ্যই টাকার উৎস দেখাতে হবে। যদি বাদী তার ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নে এই ঋণের কথা উল্লেখ না করেন, তবে সেটি বাদীর দাবির বিরুদ্ধে একটি বড় প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
উচ্চ আদালতের নজির অনুযায়ী, কেবল চেক হাতে থাকলেই কেউ টাকা পাবে না, বরং ওই টাকা পাওনা হওয়ার পেছনে একটি বৈধ ব্যবসায়িক বা আইনী সম্পর্ক থাকতে হবে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।