# তালিকায় ২৮ চাঁদাবাজ, ৪৭ সন্ত্রাসী ও ৪০০ মাদক কারবারী
# বিএনপির শীর্ষ এক নেতার নাম থাকায় নগরজুড়ে তোলপাড়
# স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে অভিযান: কেএমপি কমিশনার
# নতুন সরকারের এক মাসে ৭ আলোচিত হত্যাকাণ্ড, ৮ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর
খুলনা নগরে ২৮ জন চাঁদাবাজ, ৪৭ সন্ত্রাসী ও ৪০০ মাদক কারবারীসহ মোট ৪৭৫ জন অপরাধী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ এ তালিকা তৈরী করেছে। চাদাঁবাজদের তালিকায় ক্ষমতাসীন দলের মহানগরের একজন শীর্ষ নেতাসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। রয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিকও। তালিকায় শীর্ষ নেতার নাম লিপিবদ্ধ হওয়ার খবরে খুলনা নগরজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারীদের মধ্যে খুলনার শীর্ষ ৮টি সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম তালিকার উপরের দিকে আছে। তালিকাভুক্ত এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঈদের পর যৌথ অভিযান শুরু হবে বলে গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিএনপি সরকার গঠন করার পর সারাদেশে অপরাধীদের তালিকা তৈরীর নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা অনুযায়ী- অপরাধীদের তালিকা তৈরী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র থেকে তথ্য নিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরী করা হয়।
সূত্র জানায়, কয়েকটি ক্যাটাগরীতে এ তালিকা করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক, শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন, অস্ত্রবাজ, মাদক বিক্রেতা ও স্বর্ণ চোরাচালানকারীরা এ তালিকায় রয়েছে।
২৮ চাঁদাবাজের তালিকায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতার নাম
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ক্যাটাগরীতে খুলনা মহানগর বিএনপির শীর্ষ এক নেতার নাম উপরের দিকে রয়েছে। ২০২৪ সালের ০৫ অগাস্টের পরে ওই নেতা খুলনা শহরে যে পরিমাণ চাঁদা তুলেছেন তা অতীতের যেকোনো সময়ের চাঁদাবাজকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। ওই নেতার বিরুদ্ধে ওই সময় শুধুমাত্র সোনার চোরাচালান সিন্ডিকেট থেকে ২৭ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে গোয়েন্দাদের হাতে।
গোয়েন্দা সূত্রটি আরও জানায়, ০৫ অগাস্ট সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ ঘরনার খুলনার কুখ্যাত এক ভূমিদস্যুর কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন ওই নেতা। ওই নেতা সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেকের ঠিকাদারি এক ব্যবসায়িক পার্টনারের মাধ্যমে চলমান ৬০০ কোটি টাকার একটি কাজের পার্টনারশিপ হিসেবে কাজ করছেন।
গোয়েন্দা সূত্রটি জানায়, খুলনা সিটি কর্পোরেশনে প্রভাব খাটিয়ে বেনামে প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাঁচটি কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া ওই নেতার বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে নিরীহ ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা নেওয়া, খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র এক নেতা ও ধনুকবেরের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায়, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড, বিভিন্ন বাজার সমিতি, বিভিন্ন বাজার থেকে নিয়মিত অংকের চাদা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'ওই নেতার বিরুদ্ধে খুলনা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মাসিক ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও খুলনা শহরের সকল দখলদারির ভাগ, মাদক ব্যবসায়ীদের থেকে নিয়মিত ভাগ পান তিনি।
ওই সূত্রটি আরও জানায়, বিএনপির বিতর্কিত ওই নেতা ০৫ অগাস্টের আগে সংসারের বাজার খরচ চালাতে পারতেন না তিনি। নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় চলতো তার প্রতিদিনের ব্যায়। কিন্তু পটপরিবর্তন হওয়ার পর কিনেছেন দুটি ভেসেল জাহাজ এবং ভাড়া দিয়েছেন একটি কোম্পানির কাছে। এখন নিজে চলেন হ্যারিয়ার গাড়িতে, তার বউ-ছেলে চড়েন প্রিমিও গাড়িতে।
সূত্রটি জানায়, খুলনার আলোচিত শেখ বাড়ির ভেসের ও কার্গো জাহাজগুলো চলে ওই নেতার আশীর্বাদে। নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ডন সাবেক আওয়ামী লীগের গড ফাদারের সাথে। নিয়মিত মদ পান করার জন্য নিয়েছেন খুলনা ক্লাবের সার্ভিস সদস্য। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ফুটপাতের হকারদের থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়সহ পাওয়া গেছে ছোট বড় হাজারো অভিযোগ।
এছাড়া, তালিকায় রয়েছে সদর থানা বিএনপির পদধারী এক নেতার নাম। ০৫ অগাস্টের পর রেলের সম্পত্তি দখল, বড় বাজার ব্যবসায়ীদের জিম্মি ও মামলার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছেন। বর্তমানে শহরে ভাসমান হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করছেন বলে সূত্রটি জানায়।
তালিকায় রয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতার নাম। যারা মব সৃষ্টি করে অর্থ বৈভবের মালিক হয়েছেন।
৪৭ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের তালিকায় শীর্ষ ৮ সন্ত্রাসী গ্রুপ
গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে একাধিক সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত খুনোখুনি হচ্ছে। এ সময়ে ৭০টির উপরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের নিষিষ্ক্রতায় সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, এমন দাবি সাধারণ মানুষের।
এদিকে, খুলনার প্রতিটি বস্তিতে একাধিক অস্ত্রধারীর অবাধ বিচরণ থাকায় প্রশাসন উদ্বিগ্ন। পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্যমতে, মহানগরীর ৩০২টি বস্তিতে দু'জন করে প্রশিক্ষিত শুটার রয়েছে। এছাড়া এসব বস্তিতে গড়ে চার জন করে নারী মাদক বিক্রেতা রয়েছেন। যারা খুবই ভয়ানক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, 'খুলনায় আটটি সন্ত্রাসী গ্রুপের অস্তিত্ব রয়েছে। খুলনা নগরীতে কিশোর গ্যাং নিয়ে গড়ে ওঠে রোহান ও পলাশ গ্রুপ। পরে এই দুই গ্রুপ ভেঙে গিয়ে তিনটি বাহিনীতে রূপ নেয়। পলাশ, গ্রেনেড বাবু এবং নুর আজিম আলাদা বাহিনী গঠন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থী হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন ও নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের আলাদা বাহিনী রয়েছে। নতুন করে আলোচনায় এসেছে নগরের টুটপাড়া এলাকার আশিক গ্রুপ।'
তিনি বলেন, 'নাসিম শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে জেল হাজতে থাকায় এই বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নাসিম এবং অন্য বাহিনীর প্রধান আরমান খুলনার নতুন কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফলে খুলনায় এখন আটটি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।'
এছাড়া, নগরের ৩০২ বস্তিসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়, অলিগলিতে ৪০০ মাদক কারবারী রয়েছে। মাদক বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ নারী।
জানতে চাইলে সত্যতা স্বীকার করে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ জাহিদুল হাসান বলেন, 'নতুন তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে ঈদের পরে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।'
তিনি বলেন, 'তবে সন্ত্রাসী, অপরাধীদের দমন করতে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'চাঁদাবাজ যে দলেরই হোক তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত সমাজ গড়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কাজেই খুব শীঘ্রই অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হবে।'
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেলেই ঈদের পরে যৌথ অভিযান পরিচালনার ইঙ্গিত দেন এই কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, 'চাঁদাবাজ, দখলদার, মাদক ব্যবসায়ী যদি আমার দলের নেতাকর্মীও হয় তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। আজ থেকে আর কাউকে ছাড় দেওয়া হবে। আমরা খুলনা শহরকে শান্তির শহর হিসেবে দেখতে চাই।'
এক মাসে আলোচিত ৭ হত্যাকাণ্ড
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর খুলনা জেলা ও মহানগরীতে সাতটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ডগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচন্ড ভীতির সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে রূপসা উপজেলার জয়দেব গ্রামের মোহর আলী শেখ ওরফে নুর আলী ও তা স্ত্রী হোসনে আরা ওরফে পুতুল ঘুমিয়ে ছিলেন। পরের দিন স্বামীকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে স্ত্রী। ঘটনার ১১ ঘন্টা পর উপজেলার রমনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় স্ত্রীকে।
এ ঘটনার দু’দিন পর দৌলতপুর থানাধীন রেলিগেট এলাকায় ইজিবাইক ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য খুন হন চালক রানা হাওলাদার। ঘটনার একদিন পর নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২৫ ফেব্রুয়ারি জেলার তেরখাদা উপজেলায় বিএনপি’র দু’গ্রুপের সংঘর্ষে বোমার আঘাতে আব্দুল্লাহ আল মামুন গুরুতর আহত হয়। ০১ মার্চ দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২৬ মার্চ দুপুরে খুলনার খানজাহান আলী থানাধীন আফিল গেট পেট্রোল পাম্প এলাকা সংলগ্ন একটি গ্যারেজে মোটরসাইকেল মেরামত করছিলেন ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখ। একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই সন্ত্রাসী তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ হত্যাকাণ্ডের একদিন পর দিঘলিয়া উপজেলা সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদল নেতা মুরাদ খানকে প্রকাশ্যে দিবালোকে বহিস্কৃত ছাত্রদল নেতা সাজ্জাতসহ তার বাহিনীর সদস্যরা কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় পুলিশ ছাত্রদল নেতাকে ঢাকার তেজগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।
০১ মার্চ রাতে সন্ত্রাসীর গুলি ও ধারালো অস্ত্রাঘাতে নগরীর নিরালা কাঁচা বাজার সংলগ্ন জাহিদুর রহমান ক্রস রোডে গুরুতর আহত হন আজিজুর শেখ। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
০৪ মার্চ রাতে খুলনায় ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছিলেন রূপসা উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ। রাত ৯টার দিকে নগরীর ডাকবাংলো মোড়ে জুতার শো-রুমে পরিবারের সদস্যদের সামনে গুলি ও কুপিয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই রাতেই নগরীর লবনচরা এলাকায় সন্ত্রাসীদের মিস টার্গেটে গুলিবিদ্ধ হন রিকশাচালক হাবিবুর রহমান।
খুলনার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কেএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম বলেন, 'নগরীতে যতগুলো হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে তার সব ক’টি শনাক্ত করা হয়েছে। আসামি ধরতেও আমরা সক্ষম হয়েছি। শনাক্ত হয়নি এমন হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা খুবই কম।'
তিনি বলেন, 'অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরন করছি। চাঁদাবাজ, মাদক ও সন্ত্রাসীদের যে নতুন তালিকা হয়েছে সেই তালিকা অনুসরণ করে খুলনায় অভিযান শুরু হয়েছে।'
এমএ