পটুয়াখালীর বাউফলে চলতি অর্থবছরে ধান চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাদ্য কর্মকর্তা, মিলার, দালাল ও কালোবাজারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচীর বরাদ্দকৃত চাল মজুদ করে আমন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দেখানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। অবশ্য বিষয়টি স্বীকার করেননি সংশ্লিষ্ট মিলার ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
সূত্র জানায়, চলতি বছর বাউফল উপজেলায় মোট ১৯০৭ মেট্রিক টন চাল ও ১২৯ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করা হয়। গত বছরের নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ না করে দালাল সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নেওয়া হয়। অপরদিকে চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুকুর চুরির ঘটনা ঘটেছে। ধান চাল সংগ্রহ মৌসুমে বাউফল উপজেলায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১৩৩ মেট্রিক টন চাল ও ১৩৩ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলার ২টি খাদ্য গুদামে গম না থাকায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পরবর্তীতে গমের পরিবর্তে চাল বরাদ্দ দেয় উপজেলা প্রশাসন। বরাদ্দকৃত ২৬৬ মেট্রিকটন চালের বিপরীতে মোট ৬১টি প্রকল্প হাতে নেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে ওই প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২০০ মেট্রিকটন চাল উত্তোলন করা হয়। অধিকাংশ প্রকল্প কমিটি কালোবাজারিদের কাছে প্রতিটন চাল ৩১ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। কালোবাজারিরা প্রকল্প কমিটির কাছ থেকে ডেলিভারী অর্ডার নিয়ে তা দালালদের মাধ্যমে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার কাছে পৌছে দেন। খাদ্য গুদাম কর্মকর্তারা ডেলিভারী না দিয়ে সংগ্রহ অভিযানের নামে ওই চাল মজুদ করে রাখেন।
এ বছর সংগ্রহ অভিযানের প্রতিটন চালের সরকারি মূল্য নির্ধারন করা ছিল ৫০ হাজার টাকা। আর একই সময় প্রকল্পের চাল বিক্রি হয়েছে প্রতিটন ৩১ হাজার টাকায়। এভাবে প্রতিটন চালে প্রায় ১৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা, মিলার, দালাল ও কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
উপজেলা খাদ্য অফিস সূত্র জানায়, কাগজে কলমে চলতি বছর বাউফল উপজেলায় সোনাই ও সিকদার অটো রাইচ মিল, প্যাদা, হিরন বালা ও সুচিত্রা হাসকিং মিলার সংগ্রহ অভিযানের চাল সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে প্যাদা, হিরন বালা ও সুচিত্রা হাসকিং মিলার দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ। সোনাই ও সিকদার অটো রাইচ মিল বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। সরকারি উদ্যোগে ধান চাল সংগ্রহ মৌসুমে কয়েকদিনের জন্য সোনাই ও সিকদার অটো রাইচ মিল সচল দেখানো হয়। ওই দুটি মিল বাজার থেকে কম দামে চাল ক্রয় করে গুদামে সরবরাহ করে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি সরকারি বরাদ্দকৃত চাল খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা ও মিলারের যোগসাজসে কালোবাজারিদের কাছ থেকে ক্রয় করে ওই দুটি মিলের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। চলতি বছর বগা খাদ্য গুদামে ১২২৫ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহ করা হয়। এই চাল সোনাই অটো রাইস মিল থেকে সরবরাহ করা হয়েছে বলে কাগজে কলমে দেখানো হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০ মেট্রিক টন চাল কাবিখা প্রকল্পের বলে জানা যায়। অপরদিকে কালাইয়া খাদ্য গুদামে ৬৮২ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে প্রায় ৯০ মেট্রিক টন চাল কাবিখা প্রকল্পের বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সিকদার অটো রাইস মিলের মালিক গণি সিকদার ও সোনাই অটো রাইস মিলের মালিক স্বপণ চৌধুরি বলেন, স্থানীয় বাজার থেকে ধান সংগ্রহের পর আমাদের মিলে প্রক্রিয়ার পর সঠিক মান নিশ্চিত হয়ে চাহিদা মোতাবেক সংগ্রহ অভিযানের চাল সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে সরকারি খাদ্য গুদামের চাল নিম্মমানের দাবী করে কেশবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহজাহান গাজী বলেন, জেলে সহায়তা, ভিজিডি ও খাদ্য বান্ধবসহ নানা কর্মসূচীতে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য গুদাম থেকে নিম্মমানের চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। নিম্মমানের হওয়ায় অনেক সুবিধভোগী চাল না নেওয়ার ইউনিয়ন পরিষদের গুদামে পড়ে থাকে।
একটি সূত্র জানায়, কাবিখা প্রকল্পের চাল সংগ্রহের মাধ্যমে দীর্ঘদিন মজুদ করে রাখায় গুনগত মান নষ্ট হয়ে যায়। আর ওই নিম্মমানের চাল একপর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের নানান সামাজিক কর্মসূচীতে সরবরাহ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল্লাহ বলেন, কাবিখা বা অন্য যেকোনো প্রকল্পের ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানে দেখানোর সুযোগ নেই। সরকারি নিয়ম অনুসরণ করেই বাউফল উপজেলায় ধান ও চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কোন প্রকার অনিয়ম হয়নি।
তিনি বলেন, যে সময় কাবিখা প্রকল্পের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার আগেই আমাদের ধান চাল সংগ্রহ অভিযান শেষ হয়েছে। সুতরাং এ কাজ করার প্রশ্নই আসে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিভ্রান্ত করার জন্য কেউ এভাবে মিথ্যা রটাচ্ছে।
এএস/এসআর