ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ফুলবাড়ীতে বর্ণিল আয়োজনে দোল উৎসব আয়োজন
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬, ৫:৩৭ পিএম
X

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বর্ণিল আয়োজনে প্রায় ৩শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক দোল উৎসবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেলা প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বুধবার সন্ধ্যায় জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দোল মূর্তিগুলো আনা হয়। এরপর দোল উৎসবে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাব ঘটে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আমন্ত্রিত ভক্তরা ভগবানের মূর্তি (সিংহাসন) কাঁধে করে জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণের বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠে নাচতে নাচতে আসেন। এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো ভক্তের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠে জমিদারবাড়ির মেলা প্রাঙ্গণ।

গৌর পূর্ণিমা এলেই দোল উৎসবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার সখা-সখীদের নিয়ে দোলায় চড়ে আনন্দ উৎসব করেন—এমন বিশ্বাস রয়েছে ভক্তদের মধ্যে। এই উপলক্ষে প্রায় ৩শ বছর ধরে নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ‘দোলের মেলা’।

দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দোলের মেলাটি এ অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য। বৃহত্তর রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে ভক্তরা এ মেলায় অংশগ্রহণ করেন।

মেলা স্থানে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতি বছরের মতো এ বছরও ৪৬টি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দোল মূর্তি আনা হয়। ছোট দোল মূর্তি চারজন এবং বড় দোল মূর্তি ৮-১০ জন ভক্ত কাঁধে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেলা প্রাঙ্গণে ঢাক-ঢোলের বাজনায় পৌরাণিক নৃত্যের তালে তালে ঘুরে বেড়ান।

এ সময় উপস্থিত ভক্তরা পরিবারসহ ভক্তিময় চিত্তে নিজেদেরকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমর্পণ করে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে মেলা উপভোগ করেন।

মেলা কমিটি জানায়, বাংলা ১৩০৪ সনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর জমিদারের বংশধররা সবকিছু ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলায় চলে যান। বর্তমানে তারা কোচবিহার জেলা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যবাহী জাঁকজমকপূর্ণ দোল উৎসবটি ধরে রাখতে প্রতি বছর বর্ণাঢ্য আয়োজনে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এটি পালন করে আসছেন।

বুধবার (৪ মার্চ) সকাল ৯টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত মেলাটি চলে। পরদিন বৃহস্পতিবার ‘বাসি মেলা’ সকাল ৮টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ির দোল উৎসব ও মেলার সমাপ্তি ঘটে।

অন্যদিকে একইভাবে উপজেলার ফুলবাড়ী সদর ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের রাবাইটারী দোলের পাঠ এবং রাবাইটারী বসুনিয়াপাড়া দোলের পাঠ প্রাঙ্গণেও ছোট ও মাঝারি পরিসরে দোল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

পূজারী বীরেন্দ্র নাথ বর্ম্মন জানান, তিন দিনব্যাপী দোল উৎসবটি সোমবার (২ মার্চ) রাতে ন্যাড়া (ঘর) পোড়ানোর মধ্য দিয়ে দোলযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন মন্দিরে পূজা, হোমযজ্ঞ, প্রসাদ বিতরণসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতিটি মন্দিরে সকাল থেকেই শত শত ভক্তের সমাগম ঘটে এবং ভক্তরা রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহের সামনে নিজেদের আবিরে রাঙিয়ে তোলেন। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা তাদের মনের কামনা-বাসনা এবং সংসারে সুখ-শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন।

তিনি আরও জানান, দোলযাত্রা হিন্দু বৈষ্ণবদের অন্যতম উৎসব। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী এ দিন শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধিকা ও তার সখীদের সঙ্গে আবির খেলেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি। এ কারণে দোলযাত্রার দিন রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আবিরে রাঙিয়ে দোলায় চড়িয়ে নগরকীর্তনে বের হন ভক্তরা।

এ সময় তারা রং খেলার আনন্দে মেতে ওঠেন। একসময় পুষ্পরেণু ছিটিয়ে রাধা-কৃষ্ণের দোল উৎসব পালন করা হতো। সময়ের বিবর্তনে পুষ্পরেণুর জায়গায় এসেছে ‘আবির’।

মঙ্গলবার দোল উৎসবের দ্বিতীয় দিনে দিনব্যাপী উপবাস থেকে ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের চরণে ধাবিত হন। বুধবার সকালে পূজা শেষে দুপুর ১টার দিকে বিভিন্ন এলাকায় যেসব বাড়িতে দোল মূর্তি নেই, সেসব বাড়িতে নিমন্ত্রণ পালনের জন্য সওয়ারিরা বাহারি সাজে সজ্জিত হয়ে দোল মূর্তি সিংহাসনে কাঁধে নিয়ে যান। সেখানে বাড়ির লোকজন দোল ঠাকুরের পূজা-অর্চনা ও বরণ করেন এবং পায়ে আবির দিয়ে পরিবার ও জগতের মঙ্গল কামনা করেন।

পরে নিমন্ত্রণ শেষে সন্ধ্যা হওয়ার পর নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দোল মেলায় অংশ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত আনন্দমুখর পরিবেশে দোল উৎসব পালন করা হয়।

চট্টগ্রাম থেকে আসা ভক্ত শিক্ষিকা বৃষ্টি চৌধুরী জানান, বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের দোল উৎসবের কথা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি। অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল দেশের উত্তরের সীমান্তঘেঁষা কুড়িগ্রাম জেলার নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দোল মেলায় আসার। অবশেষে ২০২৬ সালে এসে সেই ইচ্ছা পূরণ হলো। আমি আমার এক ছোট ভাইকে নিয়ে মেলায় এসেছি। এখানে দোল উৎসবটি সত্যিই জাঁকজমকপূর্ণভাবে হয়েছে। খুব ভালো লেগেছে। আবার সুযোগ পেলে দোল মেলায় আসার ইচ্ছা রয়েছে।

রাজারহাট উপজেলা থেকে আসা অভিজিৎ চন্দ্র জানান, নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণের দোল উৎসবটি অনেক পুরনো ঐতিহ্য। শৈশবকাল থেকে এখানকার দোল উৎসবে আসছি। মেলায় এসে সত্যিই মনের প্রশান্তি ফিরে পাই।

দোলের মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি শুশীল কুমার রায় ও সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র রায় জানান, প্রায় ৩শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক দোল উৎসবে দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ঐতিহ্যবাহী দোলের মেলা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে।

তারা জানান, এখন জমিদার নেই, কিন্তু জমিদারবাড়ি রয়েছে। সেই জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণেই দোল উৎসবের আয়োজন করা হয়। মেলায় অংশ নেওয়া দোল মূর্তিগুলোকে রাত ১২টায় বিদায় জানানো হয়। শত শত দোকানে বেচাকেনা চলে রাত দেড়টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার বাসি মেলা চলে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অনীল চন্দ্র রায় জানান, প্রায় ৩শ বছরের ঐতিহ্যবাহী নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশে দোল উৎসব পালন করা হয়েছে। নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়িসহ উপজেলায় আরও তিনটি স্থানে ছোট ও মাঝারি পরিসরে দোল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির মেলায় দায়িত্বরত ফুলবাড়ী থানার এএসআই আব্দুল মালেক জানান, ঐতিহ্যবাহী মন্দির প্রাঙ্গণে দোল উৎসবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো দর্শনার্থী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উপভোগ করেছেন। মেলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশ, গ্রাম পুলিশ ও মেলা কমিটির সদস্যরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ফলে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও দোল উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এসি/আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝