আলু নিয়ে কৃষকের লোকসান কাটছেই না। মাঠ থেকে পাইকারি বাজার—সর্বত্রই নওগাঁয় আলুর বাজারে ধস নেমেছে। গেল বছর সরকার আলুর বাজারমূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তাতে উৎপাদন খরচ ওঠেনি। এবার পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। প্রতি কেজি আলুর দর নেমেছে ৫ থেকে ৭ টাকার মধ্যে, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম। তবে ভোক্তা পর্যায়ে দাম স্থিতিশীল থাকলেও কৃষক পাচ্ছেন না ন্যায্য দাম।
কৃষকেরা বলছেন, এ বছর আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি খরচ ১২ থেকে ১৫ টাকা। বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকে গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য ৫ থেকে ৭ টাকার বেশি মিলছে না। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। উঠছে না আলু তোলার শ্রমিক খরচ। তার ওপর হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় আলু সংরক্ষণ নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টন। গত মৌসুমে জেলায় আলু চাষ হয়েছিল ২৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ টন। সে হিসাবে এ বছর জেলায় ৩ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে।
সদর উপজেলার বক্তারপুর এলাকার কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘গত মৌসুমেও আলু চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ঋণ ও ধারদেনা করে এবারও দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করি। কিন্তু এবারও উৎপাদন খরচ তুলতে পারব না।’
বদলগাছী উপজেলার বালুভরা এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে পাইকারি বাজারে জাতভেদে প্রতি কেজি আলু ৫ থেকে ৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ আলু তোলার কাজে একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এক বিঘা জমিতে আলু তুলতে শ্রমিক লাগে ৮ থেকে ১০ জন। এছাড়াও রয়েছে পরিবহন খরচ। এ দামে আলু বিক্রি করে শ্রমিক ও পরিবহনের খরচ উঠছে না।’
আরেক কৃষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে জাতভেদে ৫ থেকে ৭ টাকা কেজিতে। আলু চাষ করে মনে হয় পাপ করেছি।’
মান্দা উপজেলার মৈনম এলাকার কৃষক ইদ্রিস উদ্দিন বলেন, ‘এবার ১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। আলু তোলার পর দাম না থাকায় বিক্রি ও রাখার জায়গার সংকটে ঠিকমতো সংরক্ষণ করতে পারছি না। হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় আলু সংরক্ষণ নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা।’
রানীনগর উপজেলার মিরাট এলাকার বাচ্চু মণ্ডল বলেন, ‘তিন বিঘায় আলু আবাদ করেছি। বাজারে দাম না থাকায় এবারও খরচ উঠবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০-২২ বছর ধরে আলু চাষ করছি। এবছরের মতো এত কম দামে আলু কখনো বিক্রি করিনি। ফলে আগামী বছর অন্য ফসলের চাষ করব।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও অনেক কৃষক আলু চাষ করেছেন। এখন উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে সরবরাহ বেড়েছে বলেই দাম কমেছে।’
কেএইচ/আরএন