চেকের মামলার প্রাণ হচ্ছে ‘বৈধ দায়-দেনা’। চেকটি অবশ্যই কোনো ‘বৈধ দায় বা ঋণ’ পরিশোধের জন্য হতে হবে। যদি আসামী প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি কোনো টাকা ধার করেননি বরং চেকটি চুরি হয়েছিল, জোর করে নেওয়া হয়েছিল বা সিকিউরিটি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং কোনো পাওনা নেই, তবে তিনি খালাস পেতে পারেন। (ইমরান রশিদ বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য)।
কাজেই চেক ডিসঅনার মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষীদের জেরা এবং সাফাই সাক্ষী দিয়ে আসামী তার নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারে। চেকের ১৩৮ ধারার মামলাতে আসামীপক্ষ থেকে যে সমস্ত ডিফেন্স নিয়ে আসামী খালাস পেতে পারেন, তার মধ্যে অন্যতম-
১. মামলাটি যদি সঠিক আদালতে দায়ের না করা হয়ে থাকে।
২. চেক ডিসঅনার হওয়ার আগেই যদি মামলা দায়ের হয়।
৩. ৪৩ ধারা মতে চেকের যদি কোনো কলাম পূরণ না করা হয়ে থাকে।
৪. ৫৮ ধারা মতে চেকটি প্রতারণামূলক ভাবে বা চুরি করে মামলা দায়ের করা হয়ে থাকে।
৫. আসামীকে যদি ১৩৮ ধারার নোটিশ না দেয়া হয়ে থাকে।
৬. আসামীকে টাকা পরিশোধের জন্য ৩০ দিন সময় দেয়া না হয়ে থাকে।
৭. নালিশী দরখাস্তে মামলা উদ্ভব হওয়ার কারণ উল্লেখ না থাকলে।
৮. মামলাটি আইন নির্ধারিত সময় সীমার মধ্যে দায়ের হয়ে না থাকলে।
৯. চেকটি ৬ মাসের মধ্যে নগদায়নের জন্য জমা না হয়ে থাকলে।
১০. চেকটি ।৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর ডিসঅনার হলে।
১১. ১৩৮ ধারার শর্তাবলী পালিত না হলে।
১২. মামলা দায়েরের আগেই বাদীর দাবীকৃত টাকা আসামী নগদে পরিশোধ করে থাকলে।
১৩. চেকে উল্লিখিত টাকার চেয়ে বেশি টাকা নোটিশে দাবি করলে সেটি আইনের চোখে ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। আবার চেকের উপর ওভাররাইটিং থাকলে কিংবা টেম্পারিং করে তর্কিত চেকের টাকার অংক পরিবর্তন করলেও আসামী খালাস পাবে।
এ ক্ষেত্রে ভারতের পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা হাইকোর্ট ২০১০ সালে ডিসিআর ১ নং ভলিউমের ১০৮ পৃষ্ঠায় একটি দারুণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আবার আসামীর স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখা হলে এনআই এ্যাক্টের ৩ (ই) ধারার বিধান অনুসারে এটাকে ইস্যুয়েন্স অব চেক বলা যাবে না। সেই চেক আইনানুগ ভাবে বৈধ হবে না। এ বিষয়ে ৫৬ ডিএলআর ৬৩৬ পৃষ্ঠায় একটি দারুণ সিদ্ধান্ত আছে।
এছাড়া, নোটিশটি আসামীর সঠিক ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে কি-না। যদি আসামী প্রমাণ করতে পারেন তিনি নোটিশ পাননি এবং এটি ভুল ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে, তবে তিনি সুবিধা পাবেন।
আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি সংক্রান্ত ত্রুটি থাকলে আসামী ডিফেন্স নিতে পারেন। যদি পাওনাদার নিজে মামলা না করে অন্য কাউকে দিয়ে মামলা করান এবং সেই ব্যক্তির কাছে সঠিক এবং যথাযথ 'পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি' থাকতে হবে। আইনি ভাবে যদি পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভুল থাকে, তবে মামলার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। ক্ষমতাপত্রটি পাওয়ার অব এ্যাটর্নি এ্যাক্ট, ২০১২ এর ২(৭) ধারা অনুযায়ী সাধারণ পাওয়ার অব এ্যাটর্নি আইন অনুযায়ী সম্পাদিত হতে হবে।
দ্যা স্ট্যাম্প এ্যাক্ট, ১৮৯৯ এর প্রথম তফসিলের ৪৮(বি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্ষমতাপত্রটি ১৫০০ টাকার স্ট্যাম্পড পেপার ড্র না হলে ক্ষমতাপত্রটি আইনানুগ ভাবে সম্পাদিত হয়নি বলে ধরে নেয়া হবে। কাজেই আইনগত ভাবে বাদীর উপর আমমোক্তারনামা সম্পাদিত না হওয়ায় দায়েরকৃত নালিশী মামলাটি আইনগত ভাবে অচল এবং বেআইনি হতে পারে।
আর যদি চেকটি কোনো কোম্পানির হয়, তাহলে মামলায় কোম্পানিকে আসামী করা বাধ্যতামূলক। শুধু কোম্পানির এমডি বা ম্যানেজারকে আসামী করে কোম্পানিকে আসামী না করলে মামলাটি টেকনিক্যাল কারণে খারিজ হতে পারে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।
ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com
এমএ