গত ৩০ নভেম্বর খুলনায় আদালত চত্বরের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে প্রকাশ্যে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে কারাগার থেকে মুক্তি পান শীর্ষ চরমপন্থী দলের দুই প্রধান নাসিমুন গণি ওরফে নাসিম এবং আরমান ওরফে আরমিন শেখ।
দৌলতপুরের আরেক সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নাসিম ও আরমান হাইকোর্টের জামিন নিয়ে জেল থেকে বের হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তারা আত্মগেপেনে থেকেই অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু এই দু'জনই নন; খুলনাঞ্চল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শীর্ষ সাত সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে এ অঞ্চলে প্রায় প্রতি রাতেই গড়ে একটি করে খুন হচ্ছে। নির্বাচনের আগে খুলনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করলেও আশানুরুপ ফল আসেনি। সন্ত্রাসী, চরমপন্থী ও বনদস্যুরা গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে- ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে ভয়হীন পরিবেশে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথাও বলেছেন এই দুই দলের প্রার্থীরা।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলার গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন কোনো কোনো প্রার্থী। ফলে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে বলে অভিযোগ প্রার্থীদের।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে।
জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, 'খুলনা নগরীতে কিশোর গ্যাং নিয়ে গড়ে ওঠে রোহান ও পলাশ গ্রুপ। পরবর্তীতে এটি ভেঙ্গে গিয়ে তিনটি বাহিনীতে রূপ নেয়। পলাশ, গ্রেনেড বাবু এবং নুর আজিম আলাদা বাহিনী গঠন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থী হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন ও নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের আলাদা বাহিনী রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে জেল হাজতে থাকায় এই বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত বছরের ২৮ নভেম্বর (শুক্রবার) হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম এবং অপর বাহিনী প্রধান আরমান শেখ ওরফে আরমিন খুলনার নতুন কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফলে খুলনায় এখন সাতটি বাহিনী অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। যা কিছুটা উদ্বেগের।
এছাড়া, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলপুর, তালাসহ বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থীদের অপতৎপরতা রয়েছে। উপকূলের কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনস্যুদের ব্যাপক দাপট রয়েছে। এসব অপরাধীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝে মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ আটক হলেও তা খুবই সামান্য। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বেরিয়ে আসছে যা খুবই উদ্বেগজনক।
সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গত ২৬ জানুয়ারি বিকেল থেকে খুলনায় জয়েন্ট পেট্রোল অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযান উপলক্ষে বিজিবি, র্যাব, কোষ্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ মহড়া হয়।
বিকেলে শহীদ হাদিস পার্কে জয়েন্ট পেট্রোল অভিযান শুরুর প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নুরুল হাই মোহাম্মাদ আনাছ বলেন, 'ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে সে জন্য জনগণের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতেই এ অভিযান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।'
তিনি বলেন, 'অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি যাতে না চলে এবং কোথাও কোনো ধরনের প্রবলেম সৃষ্টি হলে এই টিম সাথে সাথে সেখানে গিয়ে কাজ করবে। কোথাও অবৈধ অস্ত্রের তথ্য জানতে পারলে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হবে।'
নির্বাচনি মাঠের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, 'খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে ২০ জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট কাজ করছে। এছাড়া প্রার্থীদের যেকোনো অভিযোগ তদন্তে জুডিশিয়াল তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইন-শৃংখলা রক্ষায় আইন-শৃংখলা সেল গঠন করা হয়েছে।'
তবে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে খুলনা-২ আসনের প্রার্থী ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, 'খুলনার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। গত এক বছরে যে খুনের ঘটনা ঘটেছে তা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এক বছরে ৫২টি খুন ও ৫০ এর উপরে লাশ নদীতে পাওয়া গেছে।'
তিনি বলেন, 'এই সময়ে আইন-শৃংখলা বাহিনী, গোয়েন্দা নজরদারী দৃশ্যমান মনে হয়নি। কাজেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, খুনীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। শক্ত চেকপোষ্ট বসাতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারী বাড়াতে হবে। মুভমেন্টটা আরও বেশী দরকার। সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি করা দরকার। ছোট ছোট ক্যাম্প করতে হবে।'
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, 'শহরে নিরাপদ দিতে না পারলে ভয়হীন পরিবেশে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। খুলনা শহরে শংকা আছে। ফ্যাসিষ্ট না থাকলেও সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া। সর্বত্র মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। মাদক বিক্রেতারা বেপরোয়া। জেলা ও নগরে অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে। কাজেই শহর ও শহরের বাইরে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে।'
সম্প্রতি খুলনা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিজে উপস্থিত হয়ে নির্বাচনে চরমপন্থী আতঙ্কের বিষয়টি তুলে ধরেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি নির্বাচনী এলাকায় অবৈধ অস্ত্রধারীদের আনাগোনা এবং চরমপন্থীদের সম্ভাব্য অপতৎপরতার আশঙ্কার কথা পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন।
গত ০৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলার অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, 'নির্বাচন কমিশন ও অর্ন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, নির্বাচনের এখনও এক সপ্তাহ বাকি, অথচ এখনই প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না।'
নাগরিক সমাজের উদ্যোগ
নির্বাচনের আগে সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার না হওযায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, 'নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকী রয়েছে। কিন্তু দুখঃজনক হলেও সত্য যে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।'
তিনি বলেন, 'খুলনায় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ০৫ অগাস্টের পর বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি। এগুলো উদ্ধারও হয়নি। মোটা দাগে বলতে গেলে খুলনার মানুষ আতংকে রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশংকা রয়েছে। খুলনার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো নয়। এখনও সময় আছে, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করতে হবে।'
সব কেন্দ্রকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে প্রশাসন
খুলনা জেলা রির্টানিং কর্মকর্তা ও খুলনা জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, 'খুলনার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি এখন আগের থেকে ভালো। আমরা ইতোমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর সাথে একাধিক বৈঠক করেছি।'
তিনি বলেন, 'নির্বাচনে সব কেন্দ্রকেই আমরা অধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আইন-শৃংখলা যাতে অবনতি না ঘটে সেই দিকেই নজর দেওয়া হচ্ছে। আশা করি সবাই মিলে একটা ভালো নির্বাচন করতে পারবো।'
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, 'কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আরও উদ্ধার হলে ভালো হতো। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে ডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীও কাজ করছে। থানাগুলো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রধারী ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের তথ্য পুলিশের কাছে না থাকায় তারা তাদের ধরতে পারছে না।'
নির্বাচন সংক্রান্তে তিনি বলেন, 'নির্বাচন তার গতিতে চলবে। এর সাথে সন্ত্রাসী এবং অস্ত্রের ব্যবহারের কোনো সম্পর্ক নেই। নিবাচনে কেউ যদি অস্ত্রের ব্যবহার করে তাকে ছাড় দেওয়া হবেনা।'
জানতে চাইলে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, 'খুলনা নগরীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রার্থীদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করি ভালো নির্বাচন হবে।'
খুলনার আট জেলায় র্যাবের ৬৮ টহল
র্যাব-৬ খুলনার অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, 'অন্যান্য মাসের তুলনায় নির্বাচনের আগে অনেক অস্ত্র ও ককটেল বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে বাহিনীর সদস্যরা। খুলনার বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে র্যাব সক্রিয় ভাবে পুলিশের পাশে থেকে আসামি গ্রেপ্তার করেছে। খুলনায় মাদক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কয়েকটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। সেগুলো নির্বাচন কেন্দ্রিক নয়।'
তিনি বলেন, 'নির্বাচন উপলক্ষে খুলনা বিভাগের আটটি জেলায় ৬৮টি টহল পরিচালনা করছে র্যাব। স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে আমরা উপস্থিত থাকব। রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কোনো কেন্দ্র আক্রন্ত হলে সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর খুলনায় আটটি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে খুলনায় ৫৮টি হত্যাকাণ্ড ও অর্ধশতাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত এক ধরনের আতংক বিরাজ করছে।
এমএ