রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর বুকে অবস্থিত বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে মানুষের মালামাল বহনের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে ঘোড়ার গাড়ি। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এসব চরের মানুষ বছরের পর বছর চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে।
বুধবার দুপুরে মানিকের চর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে ঘাস বোঝাই করে বাড়ি ফিরছিলেন এক গাড়োয়ান। পদ্মার মধ্যে অবস্থিত চকরাজাপুর ইউনিয়নের চরগুলোর মানুষ শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি আর বর্ষা মৌসুমে নৌকায় করে মালামাল পরিবহন করে। চর এলাকায় কোনো সুনির্দিষ্ট রাস্তা না থাকায় এলোমেলোভাবেই চলাচল করতে হয়। অনেক পরিবার ঘোড়ার গাড়িকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করছে।
বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর ক্যানেলের ওপর শিমুলতলাঘাট, চাঁদপুরঘাট, পালপাড়াঘাট, সরেরহাটঘাট, খায়েরহাট ক্লাবেরঘাট ও খায়েরহাট হালিম মাস্টারেরঘাটসহ মোট ছয়টি ঘাট রয়েছে। এসব ঘাটের যেকোনো একটি স্থানে সেতু নির্মাণ করা হলে চরের প্রায় ২০ হাজার মানুষ সহজেই উপজেলা সদরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে বলে স্থানীয়রা জানান।
পদ্মার মধ্যে অবস্থিত চকরাজাপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত চকরাজাপুরচর, কালীদাসখালী, লক্ষ্মীনগর, দাদপুর, উদপুর, পলাশী ফতেপুর, ফতেপুর পলাশী, নিচ পলাশী, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, দিয়াড়কাদিরপুর, মানিকের চরসহ মোট ১৫টি চর রয়েছে। এসব চরের মানুষ বর্ষা মৌসুমে নৌকায় আর শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি, বাঁশের সাঁকো কিংবা পায়ে হেঁটে পারাপার হয়।
বর্ষা মৌসুমে নৌকায় পার হতে গিয়ে পদ্মার উত্তাল স্রোতে অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। চরাঞ্চলে ৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলেও কোনো উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ নেই। ফলে মাধ্যমিক পাশের পর অনেক শিক্ষার্থী যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। যারা পড়াশোনা চালিয়ে যান, তাদের উপজেলা সদরে যাতায়াতে চরম কষ্ট পোহাতে হয়।
চরাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। তবে যাতায়াত ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য খুব কম দামে স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হয়।
মানিকের চরের ঘোড়ার গাড়ির মালিক শেখ কামাল হোসেন বলেন, “চরে নানা ধরনের ফসলের চাষ হয়। এবার আলুর ফলন ভালো হয়েছে। শুকনো মৌসুমে বস্তাপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে মাঠ থেকে বাড়ি পর্যন্ত মালামাল পৌঁছে দিই। এতে প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়ে ছয় সদস্যের সংসার মোটামুটি ভালোভাবেই চলে।”
বুধবার বিকেলে পদ্মা নদীর ঘাটে কথা হয় চকরাজাপুর চরের চৌমাদিয়া এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “শুকনো মৌসুমে মাঠ থেকে ফসল বা মালামাল তুলতে ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্ষা মৌসুমে নৌকাই একমাত্র ভরসা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে হয়। দুই মৌসুমেই ঘোড়ার গাড়ি বা পায়ে হেঁটে ঘাটে এসে তারপর নদী পার হতে হয়।”
তিনি আরও জানান, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়াড়কাদিরপুর—চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ড। এর মধ্যে ১ নম্বর আতারপাড়া ওয়ার্ডে ভোটার ৩৭৩ জন, ২ নম্বর চৌমাদিয়ায় ৫৫৬ জন এবং ৩ নম্বর দিয়াড়কাদিরপুরে ৯৮৭ জন। এই তিনটি ওয়ার্ডে প্রায় ৭৫০টি পরিবারে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০ জন। অথচ এসব চরে রয়েছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নেই কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
চরবাসীর দাবি, দ্রুত সেতু নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা হলে জীবনযাত্রার মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।
এসআর