ফেনীর তিনটি আসনে ১১ দলের মনোনীত প্রার্থী আগামী ১২ তারিখ ইনশাআল্লাহ নির্বাচিত হবেন। আপনারা তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন এবং সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন। এখন থেকেই পাহারা দিন। যেন কালো চিল আকাশ থেকে নেমে এসে কারো ভোট ছু মেরে চিনিয়ে নিতে না পারে। পাহারা দিয়ে রেজাল্ট হাতে নিয়ে ঘরে ফিরবেন।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি আরও বলেন, ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা একা নই; এগারোটি দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আমরা চাই ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। এই জাতিকে আমরা আর বিভক্ত করতে চাই না। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি মহল প্রচার করছে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে ইসলামী শিক্ষা বজায় রেখেছে তারাই। কওমি মাদরাসা আমাদের কলিজা। আমরা কথা নয়, কাজে প্রমাণ করব। যারা ভয় দেখায়, তারা স্বার্থপর। ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। পেছনে নয়, সামনে এগোবো ইনশাআল্লাহ। আপনারা এই যাত্রায় সঙ্গী হবেন। এবার শুধু জামায়াতে ইসলামের বিজয় নয়, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।
সকাল ৮টা থেকে জনসমাবেশ শুরু হয়। জনসভায় জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, এবিপি পার্টির চেয়ারম্যান ও ফেনী-২ সদর আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।
ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামের আমীর মুফতি আব্দুল হান্নানের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ফেনী-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ফেনী-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদ, ফেনী জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর এ কে এম সামছুদ্দিন, শহর জামায়াতের আমীর ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্র শিবিরের ফেনী শহর সভাপতি ওমর ফারুক এবং জেলা সভাপতি আবু হানিফ হেলাল। এ সময় জামায়াত-শিবির ও ১১ দলীয় জোটের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
যুবকদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যুবসমাজ আমার বন্ধু। বেকার ভাতা দিয়ে তোমাদের অপমান করতে চাই না। তোমাদের প্রত্যেক হাতকে দেশ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তোমাদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দিতে চাই। সেই দিনে প্রত্যেক যুবক-যুবতী নিজের দিকে ইশারা করে বলবে—‘আমিই বাংলাদেশ, দেশ আমার, এই দেশকে আমি উজাড় করে দেব।’”
তিনি বলেন, অনেকে বলেন জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে মা-বোনদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না। আমাদের মা-বোন আছে না? তারা সব করছে না? তারা যদি উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ঘরের বাইরে যেতে পারে, যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, তাহলে দেশের প্রত্যেক মা-বোনকেও সেভাবে গড়ে তুলব। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। যারা এ কথাগুলো ছড়ায়, তারা বুঝে গেছে মায়েরা কোন দিকে তাকিয়ে আছে। মায়েদের দৃষ্টি এখন মুক্ত, নতুন ও পরিবর্তনের বাংলাদেশের দিকে। মায়েদের দোয়া ও আস্থা আমাদের শক্তি।
সমান অধিকার নিশ্চিত করতে বধ্যপরিকর উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, অতীতের ব্যর্থ রাজনীতিতে যারা ফ্যাসিবাদ, একনায়কতন্ত্র উপহার দিয়েছে, দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে, সেই রাজনীতিকে আমরা লাল কার্ড দেখাতে চাই। আমাদের কাছে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই সমান। আসমানের নিচে, জমির উপরে, বাংলাদেশে যারা বসবাস করবে, তাদের সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ আমাদের বাধা দিতে পারবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা দেশকে ভালোবাসেন, তারা প্রথম ভোট ‘হ্যাঁ’-তে দেবেন। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল্যায়ন না হলে বাকি ভোটের মূল্যায়ন হবে না। ‘হ্যাঁ’ মানে স্বাধীনতা, ‘না’ মানে দাসত্ব। বাংলাদেশে রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী—এ সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই। যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাই তার স্থান অর্জন করবে। একজন সাধারণ রিকশাচালকের সন্তান মেধা বিকাশের মাধ্যমে একদিন প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে—এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই।
আবরার ফাহাদকে স্মরণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ ফেনী নদী নিয়ে কথা বলায় জীবন দিতে হয়েছে। আবরারের রূহ ফেনীবাসীর কাছে রেখে গেলাম। যতদিন ফেনী থাকবে, তিনি আপনাদের হৃদয়ে স্থান পাবেন। তিনি দেশের ন্যায়ের জন্য কথা বলায় আধিপত্যবাদীরা তাকে সহ্য করতে পারেননি।
ফেনীর লালপুল ও ওভারপাস এবং মেডিকেল কলেজের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, “দেশের কোনো জেলা মেডিকেল কলেজ থেকে বাদ যাবে না। সবগুলো হবে সরকারি মেডিকেল কলেজ। বর্তমানে ৩৩ জেলায় মেডিকেল কলেজ আছে, বাকি ৩১ জেলাতেও হবে। আল্লাহ সুযোগ দিলে ফেনী তার পাওনা পাবে। ফেনীতে মানসম্মত একটি স্টেডিয়াম নেই; এটি আধুনিক করে বিশ্বমানের করা হবে। এখানে থাকা মানুষের প্রবাসী অবদান দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ।”
ফেনীর তিনটি আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে জামায়াতের আমীর বলেন, “এরা কোনো দলের নয়, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্বাচিত। এখানে ১১টি দল একাকার। যাদের যে প্রতীক দেওয়া হয়েছে, সেটিই ১১ দলের। মিলেমিশে লড়াই করে আধিপত্যবাদ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য ও মা-বোনদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। যুব সমাজের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে হবে। ৩০০ আসনে প্রতীক তুলে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও দেশের উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে।”
বক্তব্যে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ফেনীর সন্তান বেগম খালেদা জিয়াসহ জামায়াতের প্রয়াত নেতাকর্মীদের স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
এটি/আরএন