বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, গত ১৫ বছরে ভোট ডাকাতি নিয়মিত হয়েছে, দিনের ভোট রাতের ভোটে রূপান্তরিত হয়েছে। এবারও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট ডাকাতির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাই সবাইকে ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
তিনি বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করলে দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব হবে। আমরা নতুন খাল খনন, কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড, নারীদের সহায়তা এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাই। লাখ লাখ বেকারের জন্য কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।”
রোববার সন্ধ্যায় ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল মাঠে জেলা বিএনপির আহবায়ক শেখ ফরিদ বাহারের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনি মহাসমাবেশে এসব কথা বলেন তারেক রহমান।
একটি দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা বেহেশতের টিকিট দেওয়ার কথা বলে ভোট চাইছেন, তারা নিজেরা শিরক করছেন, ভোটারদেরও ঠকাচ্ছেন। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দলটি সম্পর্কে নতুন করে জানার কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়ই তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষ জানে।
তিনি বলেন, আমরা যত পরিকল্পনার কথা বলেছি, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে দুই বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে। এই দুটো বিষয় বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের জনগণের প্রাপ্য অধিকার থেকে বিগত দিনগুলোতে বঞ্চিত করেছে। অতীতে বিএনপি যতবার দেশ পরিচালনা করেছে, বিএনপি প্রমাণ করে দেখিয়েছে- এই দুটো বিষয় একমাত্র বিএনপিই সফলভাবে করতে পারে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছি; কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, এই দেশের ভেতরে কিছু মহল ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে। গত কয়েক দিনে আপনারা দেখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট কিভাবে ডাকাতি করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, জনগণ যদি বিএনপির পাশে থাকে, আগামী দিনেও আমরা কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করব। যেন দেশের সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে যেকোনো মূল্যে বিএনপি সরকার দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে- এটা দেশবাসীর কাছে আমাদের অঙ্গীকার। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা দুর্নীতি করে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি রোধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। দুর্নীতি যেই করুক তাদের বিরুদ্ধে দেশের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আইনের কাছে অপরাধীর কোনো পরিচয় নেই। বিএনপি অতীতেও প্রমাণ করেছে এগুলো।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, একটি লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি। একটি পরিবর্তনকে সামনে রেখে আমরা একত্রিত হয়েছি। এ মাটিতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার জন্ম হয়েছে। তার সম্মান রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের। আমাদেরও দায়িত্ব আপনাদের সুখ-দুখের সাথী হয়ে থাকা। এ জেলার রক্ত রয়েছে দেশনেত্রীর খালেদা জিয়ার শরীরে।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন। বিগত ১৬ বছর মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, জনগণের সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে ছাত্র-জনতা আন্দোলন করেছিল।
সভায় ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর তিন জেলার ১৩ জন বিএনপি দলীয় প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি এদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করে তাদের কাছ থেকে আপনারা আপনাদের পাওনা বুঝে নিবেন।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন- ফেনী-১ আসনের প্রার্থী রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন ভিপি, ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু, নোয়াখালীর জয়নাল আবেদিন ফারুক, লক্ষ্মীপুরের শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক গাজী হাবীব উল্যা মানিক, আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী প্রমুখ।
ফেনীবাসীর চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ, আমরা মেডিকেল কলেজ করব, কিন্তু গ্রামের মানুষ যেন চিকিৎসা সুবিধা পায় সেজন্য সারা দেশে হেলথকেয়ার করতে চাই। যাদের কাজ হবে ঘরে ঘরে মা-বোনদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। তাদের কষ্ট করে বড় কোনো অসুখ-বিসুখ না হলে হাসপাতালে আসতে হবে না। ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর মানুষের এলাকার উন্নয়নে যেমন দাবি আছে, তেমনি বিএনপিরও আপনাদের কাছে একটি দাবি আছে। ধানের শীষকে জয়যুক্ত করাই সেই দাবি। আমরা রাজনীতি করি দেশের মানুষের জন্য। যা বলব চেষ্টা করব বাস্তবায়ন করার জন্য। জনগণই হচ্ছে বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস।
সারা দেশে খাল খনন করা হবে উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এক বছর আগে ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদি পশুর ক্ষতি হয়েছে। আমরা সারা দেশে এজন্য খাল খনন করতে চাই। খাল খনন করলে এলাকার মানুষের উপকার হবে। ঠিক একইভাবে আরেকটি পরিকল্পনা হলো সমাজের বহু তরুণ ও যুবক আছে যাদের চাকরি-বাকরি বা কর্মসংস্থান নেই। আমরা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে চট্টগ্রামে যেভাবে ইপিজেড হয়েছে, ফেনী অঞ্চলেও আমরা এমন নিয়ে আসতে চাই। তাহলে এই এলাকার মানুষ সেসব ফ্যাক্টরিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের এ এলাকার অনেক মানুষ বিদেশে যায়। তাদের যদি বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শিক্ষা দেওয়া যায় তাহলে আরও ভালো বেতনের ব্যবস্থা করা যায়। এজন্য আমরা চাই তরুণদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিখিয়ে বিদেশে পাঠাতে। এতে তাদেরও লাভ হবে, দেশেরও লাভ হবে। কারণ সে তখন যেভাবে ভালো বেতন পাবে, একইভাবে দেশের জন্য বেশি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা যাবে। এজন্য আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতা ও ধানের শীষে সমর্থন লাগবে। আগামী ১২ তারিখ ধানের শীষ বিজয়ী হলেই যেসব পরিকল্পনার কথা বলেছি তা বাস্তবায়ন করতে পারব।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশের মানুষ সাক্ষী আছে, কীভাবে গত ১৫ বছর মানুষের কথা বলার অধিকার ও ভোটের অধিকারকে দাবিয়ে রাখা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সেই স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আজ একটি পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে।
জনসভায় বৃহত্তর নোয়াখালীর তিন জেলার বিভিন্ন সংসদীয় আসনের ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়া, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীতে অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।
এসআর