সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনিতে প্রায় ৬৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪১ কিলোমিটার অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শতাধিক কিলোমিটার বাঁধ। প্রতিকূল আবহাওয়া, জোয়ারের পানি ও নদীভাঙনের আশঙ্কায় এসব এলাকার হাজারো মানুষকে রাত কাটাতে হয় বাঁধ পাহারা দিয়ে। বিশেষ করে আশাশুনির প্রতাপনগর ও আনুলিয়া এবং শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাঁধের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক সংস্কার নয়, উপকূলীয় মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন ও বাঁধ দুর্বল হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও মৎস্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বাঁধ ফুটো করে নাইনটি পাইপ বসিয়ে নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষকে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন তাঁরা।
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের শ্রীপুর-কুড়িকাহনিয়া গ্রামের আশি-ঊর্ধ্ব মনিরুদ্দীন গাজীর জীবন নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতার উদাহরণ। কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে তাঁর পাঁচ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র পাঁচ কাঠা। বৃদ্ধ বয়সে কাজ করতে না পারায় বর্তমানে থাকছেন জামাতার বাড়িতে। দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি তাঁর।
একই গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী ওমর আলীরও ছিল তিন বিঘা জমি। নদীভাঙনে সব হারিয়ে এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র দুই শতক। কপোতাক্ষ নদের ঢালে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, শ্রীপুর গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বদলে গেছে এলাকার ভৌগোলিক মানচিত্রও।
কপোতাক্ষ নদের এক পাড় ভেঙে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের নতুন গ্রাম ‘দৃষ্টিনন্দন’ গড়ে উঠেছে, অন্য পাড়ে গড়ে উঠেছে খুলনার কয়রা উপজেলার দশালিয়া গ্রাম। নদীভাঙনে সহায়-সম্বল হারানো কয়েক হাজার পরিবারের কেউ নিঃস্ব, কেউবা হয়েছেন উদ্বাস্তু। এসব মানুষের একটাই দাবি—ত্রাণ নয়, স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই।
তবে সরেজমিনে প্রতাপনগর ও কুড়িকাহনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বাঁধে নাইনটি পাইপের অস্তিত্ব দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, শ্যামনগর উপজেলার সর্বশেষ ইউনিয়ন পদ্মপুকুরে নদীভাঙনের চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ ফুটো করে নাইনটি পাইপ বসিয়ে নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষের কারণে বাঁধ দুর্বল হচ্ছে এবং নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কয়েকজন চিংড়ি চাষির স্বার্থে পুরো ইউনিয়নের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের। প্রতিবাদ করতে গেলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকি না থাকায় বছরের পর বছর এ পরিস্থিতি চলছে। নাইনটি পাইপ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ক্লোজার নির্মাণ এবং দ্রুত স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া গ্রামের স্থানীয় সংবাদকর্মী মাসুম বিল্লাহ বলেন, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলীয় অঞ্চলের ৬৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪১ কিলোমিটার অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া শতাধিক কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল খালেক বলেন, ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া, সুভদ্রাকাটি, চাকলা ও হরিষখালি—এই চারটি পয়েন্টের বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাসখানেক আগেও কুড়িকাহনিয়া পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিলে এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে তা সংস্কার করেন। এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ, জিও টিউব ও সিনথেটিক সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যয় ও সংস্কারকাজের হিসাব সম্পর্কে তাঁরা পরিষ্কার ধারণা পান না। তাই দ্রুত স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ও আনুলিয়া ইউনিয়নের বাঁধের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। একই সঙ্গে শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাঁধেরও একাধিক স্থানে ভাঙন রয়েছে।
তিনি জানান, জাইকার অর্থায়নে এসব এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চলছিল। কিন্তু জাইকা অর্থায়ন না করায় এখন সরকারি অর্থায়নে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রকল্প প্রস্তুতের কাজ চলছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আশাশুনির প্রতাপনগর ও আনুলিয়া এবং শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এসব বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।
উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা, প্রকল্প প্রণয়ন ও অর্থায়নের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রতিবার দুর্যোগের পর বাঁধ মেরামতের পরিবর্তে টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে তাঁদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের অবসান ঘটবে।
এমজেডআর/আরএন