আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা অলরাউন্ডার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ক্রিকেটবিশ্বে ‘দ্য বিগ শো’ নামে পরিচিত এই বিধ্বংসী ব্যাটার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি ভিক্টোরিয়ার হয়ে লিস্ট ‘এ’ ও চার দিনের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন ৩৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড’ পডকাস্টে নিজের অবসরের সিদ্ধান্তের কথা জানান ম্যাক্সওয়েল। শরীরকে আরও সময় দেওয়া এবং ক্যারিয়ারের বাকি টুর্নামেন্টগুলোতে খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
১৯৮৮ সালের ১৪ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে জন্ম নেওয়া ম্যাক্সওয়েলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ২০১২ সালে। একই বছর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও যাত্রা শুরু করেন তিনি। ২০১৩ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের মধ্য দিয়ে তিন সংস্করণেই অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান এই অলরাউন্ডার।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৭টি টেস্ট, ১৪৯টি ওয়ানডে ও ১৩০টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ম্যাক্সওয়েল। তিন সংস্করণ মিলিয়ে তাঁর সংগ্রহ ৭ হাজার ২২৬ রান। রয়েছে ১০টি সেঞ্চুরি ও ৫৮টি অর্ধশতক। বল হাতেও রেখেছেন কার্যকর অবদান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়েছেন ১৩৬ উইকেট। এর মধ্যে ওয়ানডেতে ৭৭, টি-টোয়েন্টিতে ৫১ এবং টেস্টে ৮ উইকেট।
তবে ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় সাদা বলের ক্রিকেট। ওয়ানডেতে ৩ হাজার ৯৯০ রান করেছেন তিনি। এই সংস্করণে তাঁর সর্বোচ্চ সংগ্রহ অপরাজিত ২০১ রান। টি-টোয়েন্টিতে ২ হাজার ৮৯৭ রান করেছেন ১৫৪.৪২ স্ট্রাইক রেটে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পাঁচটি সেঞ্চুরি করে ভারতের রোহিত শর্মার সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ডের মালিক তিনি।
ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ইনিংসগুলোর একটি ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ২৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে প্রায় পরাজয়ের মুখে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। এমন পরিস্থিতিতে একাই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন ম্যাক্সওয়েল। পেশিতে টান ও শারীরিক অস্বস্তি নিয়েও ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রান করে দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন। ইনিংসটিতে ছিল ২১টি চার ও ১০টি ছক্কা।
একই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাত্র ৪০ বলে সেঞ্চুরি করে নতুন ইতিহাস গড়েন তিনি। পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই দ্রুততম সেঞ্চুরি। এর আগে ২০১৫ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫১ বলে শতক করেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। নিজের গড়া রেকর্ড ভেঙে আবারও বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় আসেন তিনি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও তাঁর রয়েছে অসাধারণ কীর্তি। ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাত্র ৬৫ বলে অপরাজিত ১৪৫ রান করেন। এটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি অফ স্পিনে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার সামর্থ্যও তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিনটি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন ম্যাক্সওয়েল। ২০১৫ ও ২০২৩ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন তিনি। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালেও অস্ট্রেলিয়ার জয়ের মুহূর্তে উইকেটে ছিলেন এই অলরাউন্ডার।
এর আগে ২০২৫ সালে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটিই হয়ে থাকল অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। ওই ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সুযোগ না পেলেও বল হাতে ১৩ রানে ২ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
অবসরের আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে একটি বিদায়ী ম্যাচ খেলার আশা করেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। তবে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকেরা ভবিষ্যতের দল গঠনে তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেই আশা পূরণ হয়নি। বিষয়টি বুঝতে পারছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেও ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না ম্যাক্সওয়েল। অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা বিগ ব্যাশে মেলবোর্ন স্টার্সের হয়ে খেলবেন তিনি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও তাঁর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
আগ্রাসী ব্যাটিং, উদ্ভাবনী শট, কার্যকর বোলিং এবং অসম্ভব পরিস্থিতিতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে আধুনিক ক্রিকেটে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। বিশেষ করে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ২০১ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংসটি ক্রিকেট ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৭ হাজারের বেশি রান, ১৩৬ উইকেট, তিনটি বিশ্বকাপ শিরোপা আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন ‘দ্য বিগ শো’।