টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও মাছ ধরতে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন উপকূলের জেলেরা। মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে দেওয়া এ নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় বরগুনাসহ দেশের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার জেলেদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। জাল মেরামত, ট্রলার প্রস্তুত ও মাছ ধরার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গুছিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। দীর্ঘ বিরতির পর সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন উপকূলের জেলেরা।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে কর্মতৎপরতা বাড়ছে। কক্সবাজারের টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও চকরিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় জেলেরা মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের বাঁকখালী ও কর্ণফুলী নদীতীরবর্তী ফিশারিঘাটেও মাছ অবতরণ ও বিপণন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও শরীয়তপুরের জেলেদের জীবিকার সঙ্গে নদী ও সমুদ্রের মাছ আহরণ নিবিড়ভাবে জড়িত। বিশেষ করে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, মহিপুর ও আলীপুর এবং বরগুনার পাথরঘাটা সামুদ্রিক মাছ আহরণ ও অবতরণের জন্য পরিচিত।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাতেও মৎস্য আহরণ স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকায় বিধিনিষেধ শেষ হওয়ার পর জেলেরা আবারও মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
উপকূলীয় বিভিন্ন জেলেপল্লিতে দেখা যাচ্ছে, সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন, কেউ ট্রলারের ইঞ্জিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ মাছ ধরার প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করছেন।
দীর্ঘদিন মাছ ধরতে না পারায় জেলেদের অনেকেরই আয় বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞার সময় সংসারের খরচ চালাতে ধারদেনা করতে হয়েছে বলে জানান তাঁরা। এবার সাগরে গিয়ে পর্যাপ্ত ইলিশসহ অন্যান্য প্রজাতির মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা তাঁদের।
এক জেলে বলেন, “নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন মাছ ধরতে পারিনি। এ সময় সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এখন ট্রলার ও জাল প্রস্তুত করছি। সাগরে গিয়ে ভালো মাছ পেলে ধারদেনা পরিশোধ করে পরিবার নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারব।”
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৭৬ জন। তাঁদের বড় একটি অংশের জীবিকা সমুদ্র ও উপকূলীয় নদ-নদীতে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। ফলে মাছ ধরার ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তাঁদের আয়-রোজগারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে না পারায় জেলেদের পাশাপাশি মাছ পরিবহন, বরফ সরবরাহ, জাল মেরামত, ট্রলার পরিচালনা ও মাছ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষের কাজও সীমিত হয়ে পড়ে। মাছ আহরণ স্বাভাবিক হলে এসব খাতেও আবার কর্মচাঞ্চল্য বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করা এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হয়।
নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা সাগর ও নদীতে ফিরে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া গেলে জেলেদের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের আয়-রোজগারও বাড়তে পারে।
তবে সাগরে মাছের প্রাপ্যতা, আবহাওয়া এবং মাছ ধরার পরিবেশের ওপর জেলেদের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে। তাঁদের প্রত্যাশা, এবারের যাত্রায় পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়লে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ধারদেনাও কিছুটা পরিশোধ করতে পারবেন।
এএসকে / এফএস