ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
ডিগ্রিধারী বেকার বাড়ছে, দেশ ছাড়ছে মেধাবীরা
✎ বিশেষ প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৮ পিএম আপডেট: ২৮.১০.২০২৬ ৬:৫৮ পিএম
X
Advertisement

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে আজ দুটি বড় সংকট। একদিকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ মিলছে না, অন্যদিকে উন্নত শিক্ষা, ভালো চাকরি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছাড়ছেন বহু মেধাবী তরুণ। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বের হচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন, কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে অসংগত কাজ বেছে নিতে। অন্যদিকে, যাঁদের দক্ষতা ও মেধা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারত, তাঁদের একটি অংশ স্থায়ীভাবে বিদেশে বসতি গড়ছেন। এই দুই প্রবণতার পেছনে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারার ব্যর্থতা। প্রশ্ন উঠছে, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব যাঁদের হাতে যাওয়ার কথা, তাঁদের জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও হিমশিম খাচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষার বড় অংশ তত্ত্ব ও মুখস্থনির্ভর। অথচ আধুনিক শিল্প, ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতে কাজ করতে হলে প্রয়োজন ব্যবহারিক জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় অনেক তরুণই বুঝতে পারেন, তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর অভাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে হচ্ছে। এই বৈপরীত্য দেশের শিক্ষা ও অর্থনীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকেই স্পষ্ট করে।

যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির অভাব, তুলনামূলক কম বেতন, কর্মক্ষেত্রে স্বীকৃতির সংকট এবং গবেষণার সীমিত সুযোগ মেধাবীদের বিদেশমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও দেশের মেডিকেল কলেজগুলোর মতো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে। সেই শিক্ষার্থীদের অনেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর সেখানেই কর্মজীবন শুরু করেন, কেউ কেউ স্থায়ীভাবে থেকে যান। এতে তাঁদের অর্জিত দক্ষতা ও শ্রমের সুফল অন্য দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। অবশ্য বিদেশে পড়তে যাওয়া বা কাজ করা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নেও কাজে লাগতে পারে। সংকট তৈরি হয় তখন, যখন দেশের ভেতরে কাজ, গবেষণা ও পেশাগত বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় মেধাবীদের ফিরে আসার আগ্রহ কমে যায়।

মেধার মূল্যায়ন নিয়ে হতাশাও এই প্রবণতাকে তীব্র করে। একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা গবেষক যদি দেখেন, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে তদবির, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা রাজনৈতিক প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে তাঁর আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, পেশাগত স্বাধীনতা এবং গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে শুধু দেশপ্রেমের কথা বলে তাঁদের আটকে রাখা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো দক্ষ জনবলের সংকটে পড়তে পারে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। ডিগ্রিকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক কমিয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারায় আনতে হবে। স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ তৈরি করা দরকার। কারিগরি শিক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারেন এবং প্রয়োজনে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও সময়োপযোগী পরিবর্তন জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, অটোমেশন ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। তবে শুধু পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যুক্ত করলেই চলবে না। শিক্ষার্থীরা যাতে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শেখেন, সে জন্য গবেষণাগার, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা গেলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের দূরত্ব কমবে।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগত অগ্রাধিকারে পরিবর্তন এলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষা সংস্কারকে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে এমন একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা দরকার, যা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিমার্জন করবে।

একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি খাতকে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, ব্যবসা শুরুর প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থনীতিতে নতুন খাতের বিকাশ ঘটলে দক্ষ ও শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের পরিসরও বাড়বে।

তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার দিকেও বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সবাই চাকরিপ্রার্থী হবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁদের একাংশকে উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সে জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ, কার্যকর পরামর্শ, ঝুঁকিভিত্তিক বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। হাই-টেক পার্কগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার পথে আমলাতান্ত্রিক বাধা কমানোও জরুরি। একটি সুস্থ উদ্যোক্তা-পরিবেশ তৈরি হলে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ নেওয়ার সুযোগ পাবে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। প্রচলিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ, জাপানে ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। মালয়েশিয়ায় এই হার ৪৬ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ৪৯.৪ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ভর্তির হার প্রায় ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ বলা হয়ে থাকে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি কোর্স ও সাধারণ ট্রেড প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত থাকে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তুলনাযোগ্য প্রকৃত কারিগরি শিক্ষার হার ৯ থেকে ১০ শতাংশ বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এসব পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা ও পরিমাপপদ্ধতি এক কি না, তা যাচাই করা জরুরি। তবে হিসাবের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশে কর্মমুখী শিক্ষার পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো কিংবা প্রতি বছর আরও বেশি স্নাতক তৈরি করাই উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। শিক্ষার মান, কর্মমুখী দক্ষতা, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগের সুযোগকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। তরুণদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা তাঁদের কাজের উপযোগী করে তুলবে, আবার নতুন জ্ঞান অর্জন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও দেবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতির মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার বিকল্প নেই। দেশের ভেতরে যোগ্যতার স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং পেশাগত উন্নতির পথ নিশ্চিত করতে হবে। মেধাবীদের বিদেশযাত্রা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভবও নয়, কাম্যও নয়। বরং এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন এবং বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরতেও আগ্রহী হবেন। সেই পরিবেশ তৈরি করা গেলে তরুণদের মেধা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের বিকাশে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

টিআই
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝
Advertisement