বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শককে হাসানো অভিনেতা ম্যাথিউ পেরির জীবনের আড়ালে ছিল এক দীর্ঘ ব্যক্তিগত সংগ্রাম। ‘ফ্রেন্ডস’ ধারাবাহিকে চ্যান্ডলার বিং চরিত্রে অভিনয় করে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পাওয়া এই তারকার খ্যাতি, পারিবারিক সম্পর্ক ও মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই এবার উঠে এসেছে নেটফ্লিক্সের তিন পর্বের প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ওয়ান অ্যাবাউট ম্যাথিউ পেরি’-তে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মুক্তি পাওয়া নির্মাণটি ইতোমধ্যে সমালোচকদের নজর কেড়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ৫৪ বছর বয়সে পেরির মৃত্যু বিশ্বজুড়ে ভক্তদের শোকাহত করেছিল। তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন বছর পর মুক্তি পাওয়া প্রামাণ্যচিত্রটি তাঁকে শুধু পর্দার জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা হিসেবে নয়, বরং আনন্দ, একাকিত্ব, সম্পর্ক ও আসক্তির জটিলতায় জর্জরিত একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছে।
খ্যাতির স্বপ্ন, কিন্তু পূরণ হয়নি মনের শূন্যতা
পেরি ছোটবেলা থেকেই অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কানাডায় মায়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা অভিনেতা বাবা জন বেনেট পেরির সঙ্গে দেখা করতে যাতায়াতের অভিজ্ঞতাও তাঁর জীবনের অংশ ছিল। পরে লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে পরিচিত হন কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে।
১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া ‘ফ্রেন্ডস’ তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে। ২০০৪ সালে ধারাবাহিকটির শেষ পর্ব প্রচারিত হওয়ার আগেই তিনি টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু পেরির নিজের বক্তব্য ও কাছের মানুষদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, খ্যাতি তাঁর ভেতরের শূন্যতা দূর করতে পারেনি।
প্রামাণ্যচিত্রে পেরির ছোট বোন মিয়া পেরি বোউইক জানান, ভাইয়ের জীবনে একাকিত্বের অনুভূতি বারবার ফিরে আসত। তাঁর মতে, পেরির প্রতিভা ও সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের এই দিকটিও বোঝা জরুরি।
এমি পুরস্কারজয়ী নির্মাতা মেরি রবার্টসনের পরিচালনায় তৈরি প্রামাণ্যচিত্রটিতে রয়েছে পেরির পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা আগে প্রকাশিত হয়নি এমন ছবি ও ভিডিও। তাঁর ছোট বোন মিয়া, দীর্ঘদিনের বন্ধু রজার কাস্তিয়ো ও ডেভিড প্রেসম্যানসহ অভিনেতার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ব্যক্তিরা স্মৃতিচারণ করেছেন।
এটি মিয়া ও তাঁর দুই দীর্ঘদিনের বন্ধুর প্রথমবার ক্যামেরার সামনে পেরিকে নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার অভিজ্ঞতা। তাঁদের বক্তব্যে পেরির উদারতা, রসবোধ ও অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতার পাশাপাশি আসক্তির কারণে পরিবারের সদস্যদের যে মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে, সেটিও উঠে এসেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘ফ্রেন্ডস’-এর অন্য পাঁচ প্রধান অভিনয়শিল্পী এই প্রামাণ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেননি। তবে পুরোনো দৃশ্য ও আর্কাইভের ফুটেজে তাঁদের দেখা যায়। নির্মাতারা মূলত পেরির ব্যক্তিগত জীবন ও তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুদের অভিজ্ঞতার ওপরই জোর দিয়েছেন।
আসক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই
পেরির জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল অ্যালকোহল ও বিভিন্ন ওষুধের আসক্তির সঙ্গে লড়াই। ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার থেকে শুরু করে পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া, বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বারবার আসক্তিতে ফিরে যাওয়ার ঘটনা তাঁর নিজের পাশাপাশি কাছের মানুষদেরও হতাশ করেছে।
প্রামাণ্যচিত্রে মিয়া জানান, ভাইকে সুস্থ করতে পরিবার দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছে। পর্যালোচনায় আরও উঠে এসেছে, পেরি পুনর্বাসন ও সুস্থ হওয়ার চেষ্টায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তাঁর জীবনের এই অংশটি তুলে ধরতে গিয়ে নির্মাতারা কেবল মাদক ব্যবহারের ঘটনা নয়, বরং সেই লড়াইয়ের আবেগগত ও পারিবারিক মূল্যও সামনে এনেছেন।
পেরি তাঁর স্মৃতিকথা ফ্রেন্ডস, লাভার্স অ্যান্ড দ্য বিগ টেরিবল থিং-এও আসক্তি ও সুস্থ হওয়ার প্রচেষ্টার কথা লিখেছিলেন। নতুন প্রামাণ্যচিত্রটি সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে তাঁর কাছের মানুষদের নিজস্ব স্মৃতি।
মুক্তির দিন প্রকাশিত পর্যালোচনাগুলোতে সিরিজটির আন্তরিক উপস্থাপনা প্রশংসা পেয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর পর্যালোচক লুসি ম্যাঙ্গান একে ঘনিষ্ঠ ও চিন্তাশীল নির্মাণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মতে, তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য কিছুটা কমানো যেত, তবে সাক্ষাৎকারদাতাদের স্মৃতিচারণ ও আবেগের কারণে প্রামাণ্যচিত্রটি দর্শককে ধরে রাখে।
হোয়াটস অন নেটফ্লিক্স সিরিজটিকে পাঁচের মধ্যে চার নম্বর দিয়েছে। তাদের পর্যালোচনায় পেরির জীবনের সাফল্য ও আসক্তির দ্বন্দ্বকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, মিরর-এর পর্যালোচক মার্ক জেফরিসও নির্মাণটির প্রশংসা করে একে আবেগঘন ও হৃদয়বিদারক সিরিজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
শুধু চ্যান্ডলারকে স্মরণ নয়
‘দ্য ওয়ান অ্যাবাউট ম্যাথিউ পেরি’র গুরুত্ব শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, পেশাগত সাফল্য ও মানুষের ভালোবাসা থাকলেও আসক্তি এবং মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই কতটা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে এটি পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সেই অভিজ্ঞতাও সামনে আনে, যাঁরা দীর্ঘদিন প্রিয় একজন মানুষকে সুস্থ হয়ে উঠতে দেখার আশায় ছিলেন।
পেরি একসময় বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন, এবং তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিল। কিন্তু সেই খ্যাতি তাঁকে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। এই প্রামাণ্যচিত্রে তাই পর্দার হাস্যরসের পাশাপাশি উঠে এসেছে এক মানুষের অসমাপ্ত লড়াই। যে মানুষটি কোটি দর্শককে আনন্দ দিয়েছেন, কিন্তু নিজের জীবনের সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
‘দ্য ওয়ান অ্যাবাউট ম্যাথিউ পেরি’ এখন নেটফ্লিক্সে দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, হোয়াটস অন নেটফ্লিক্স।
এসএস