জাপানের চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের প্রথম দিনেই দেশটির শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট এবং মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে টোকিও পৌঁছান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের নিয়মিত ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৫ মিনিটে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
সফরের প্রথম দিনে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে তারো আসোর নেতৃত্বে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে মৈত্রী লীগের অব্যাহত অবদানের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে জাপান সফরের সময় তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে তারো আসো বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করেছে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর জোরদারে তারো আসোর সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জাপানের অব্যাহত সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা চান তারেক রহমান। তিনি তারো আসো ও মৈত্রী লীগের সদস্যদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এ সময় জাপানের সাবেক মন্ত্রী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ইয়াসুতোশি নিশিমুরা, ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশি এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জাইকার সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রী
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় জাইকার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হারা শোহেইসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও জাইকার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাইকা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
বৈঠকে জাপানের সহায়তায় চলমান বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জ্বালানি চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত বছরের মতো বাজেট সহায়তা দেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়।
জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার
এর আগে স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি এবং মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে মাসুমি কাকিনোকির ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মাসুমি কাকিনোকি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পসহ সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এসব খাতে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।
এ সময় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ১১ অক্টোবর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। সে সময় তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, সার ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
চার দিনের সফর
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে ঢাকা ত্যাগ করেন তারেক রহমান। বাংলাদেশ বিমানের নিয়মিত ফ্লাইটে সীমিতসংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে তিনি জাপানের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
সোমবার সকালে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান এবং টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সফরে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
এসএস