বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, প্রাণহানি ও অশান্তির এই সময়ে ফকির লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শন অনুসরণ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, নিজেদের সংকীর্ণতা পরিহার করে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে সমাজের বিভেদ দূর করতে হবে। ধনী-গরিব, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি না করে সবাইকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠানের সমাপনী দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, লালনের গান, গীতিকবিতা ও জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারলেই এ উৎসব আয়োজন সার্থক হবে। শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে লালনের মানবপ্রেম, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা ব্যক্তিজীবন ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। লালন সাঁই তাঁর গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানুষকে মানবিকতার যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা বর্তমান বিশ্বের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম এবং জেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার।
আলোচনা সভায় মূল আলোচক ছিলেন লালন গবেষক অধ্যাপক ড. আহমেদ শফিকা হায়দারী। এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন লালন একাডেমির উপদেষ্টা মো. মিজানুর রহমান।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ফকির লালন সাঁই বাংলা লোকসংগীত ও ভাবদর্শনের এক অনন্য সাধক। তাঁর গান ও দর্শনে জাতপাত, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে গভীর মানবিক আবেদন ফুটে উঠেছে। মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার অনুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসা, প্রেম ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর গানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
লালনের দর্শনে মানুষের পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতায়। তাঁর গান মানুষকে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, পরমতসহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে।
বক্তারা আরও বলেন, লালনের দর্শন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গান ও সাধনা মানুষের মধ্যে সাম্য, ভালোবাসা এবং ভেদাভেদহীন সমাজ গঠনের বার্তা দেয়। বর্তমান সময়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজন, সংঘাত এবং অসহিষ্ণুতা মোকাবিলায় লালনের মানবতাবাদী চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাঁরা বলেন, লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসবের তাৎপর্য কেবল তাঁর গান পরিবেশনা কিংবা তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর জীবনদর্শন অনুধাবন করে তা ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত করাই হওয়া উচিত এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসব উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে সাধু, বাউল, লালনভক্ত, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের সমাগম ঘটে। আলোচনা সভা শেষে রাতে শুরু হয় লালনসংগীতের পরিবেশনা।
-টিএস/জামাল