একটি গ্রামের পরিচিত মাঠ। সেখান থেকে শুরু হওয়া ক্রিকেটের নেশা ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে বড় প্রতিযোগিতার মঞ্চে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ঢাকা জেলার প্রতিনিধিত্ব, টানা দুইবার ফাইনালে ওঠার অভিজ্ঞতা, পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে ডিভিশন ক্যাম্পে সুযোগ-এরপর ঢাকা তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ। এখন টেপ টেনিস ক্রিকেটের পরিচিত মুখ হয়ে টেপবল বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে খেলার ডাক পেয়েছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের শাকিল হোসেন।
স্থানীয় ক্রিকেটে ‘কালীগঞ্জ এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত এই খেলোয়াড় এবার খেলবেন নোমান স্মৃতি পরিষদ-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হয়ে। এর আগে টেপবল বিপিএলের প্রথম আসরে তিনি ছিলেন সিলেট ফাইটার্সের দলে।
শাকিলের এই পথচলা কেবল একটি টুর্নামেন্টে দল পাওয়ার গল্প নয়। এটি স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেটচর্চা থেকে বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা, প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং নিজের এলাকার নামকে পরিচিত করে তোলার আকাঙ্ক্ষার গল্প।
শুরুর ঠিকানা মুনশুরপুর
গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুনশুরপুর গ্রামের আশ্রাফ আলী ও রোকছানা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান শাকিল। এই এলাকাই তাঁর পরিচয়ের শিকড়। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে চলা শাকিল সময়ের সঙ্গে স্থানীয় মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন জেলার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
টেপ টেনিস ক্রিকেটে তাঁর পরিচিতি বাড়লেও ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত। প্রচলিত ক্রিকেটের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেকে যাচাই করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর ক্রিকেটজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ফাইনাল, নজর কাড়ে পারফরম্যান্স
২০১৬-১৭ মৌসুমে ঢাকা জেলার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেটে অংশ নেন শাকিল। ওই প্রতিযোগিতায় তাঁর দল পরপর দুইবার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। তবে দুইবারই রানার্সআপ হয়ে শেষ করতে হয় দলকে।
শিরোপা জিততে না পারলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দেন শাকিল। এর ভিত্তিতে ঢাকা জেলার একমাত্র পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে বয়সভিত্তিক ডিভিশন ক্যাম্পে সুযোগ পান তিনি।
এরপর ২০১৮-১৯ মৌসুমে খেলাঘর ক্রিকেট একাডেমির হয়ে ঢাকা তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে খেলেন। এসব প্রতিযোগিতা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নির্ধারিত। ফলে টেপবল ক্রিকেটে পরিচিতি পাওয়ার আগেই প্রচলিত ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোয় খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
নেতৃত্বের সাফল্য নিজের এলাকাতেও
শাকিলের ক্রিকেটীয় পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থানীয় পর্যায়ে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া। গত বছর কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত তারুণ্যের উৎসব ক্রিকেট টুর্নামেন্টে তাঁর নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় কালীগঞ্জ পৌরসভা দল। সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুরো দলকে পুরস্কৃত করেন।
এ ছাড়া কালীগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুনশুরপুর ইয়ং স্টার দলের হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর।
স্থানীয় দলের হয়ে সাফল্য আর বিভিন্ন জেলার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ-দুই অভিজ্ঞতাই শাকিলের ক্রিকেটজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। নিজের এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি বৃহত্তর পরিসরে খেলার সুযোগ পাওয়ায় কালীগঞ্জের বাইরেও তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
টেপবল ক্রিকেটে নতুন মঞ্চ
বাংলাদেশে টেপ টেনিস ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খেলাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। বিভিন্ন জেলার খেলোয়াড়েরা এসব টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন। অনেক খেলোয়াড়ের জন্য এই ক্রিকেট পরিচিতি অর্জনের পাশাপাশি আর্থিক সাফল্যেরও সুযোগ তৈরি করছে।
শাকিলও সেই ধারার একজন খেলোয়াড়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলে নিজের পরিচিতি বাড়িয়েছেন তিনি। প্রথম টেপবল বিপিএলে সিলেট ফাইটার্সের হয়ে খেলার পর এবার দ্বিতীয় আসরে নোমান স্মৃতি পরিষদ-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হয়ে সুযোগ পেয়েছেন।
এই সুযোগ তাঁর জন্য নতুন দলের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নিজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য তুলে ধরার আরেকটি ক্ষেত্র। তবে শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে নতুন আসরে তাঁর অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরে যে প্রত্যাশা
শাকিলের ক্রিকেটযাত্রায় ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি নিজের এলাকার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মুনশুরপুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি কালীগঞ্জের নাম পরিচিত করানোর সুযোগ পেয়েছেন।
তাঁর সামনে এখন টেপবল বিপিএলের দ্বিতীয় আসর। সেখানে ভালো খেলা, দলের সাফল্যে অবদান রাখা এবং নিজের ক্রিকেটীয় অবস্থান আরও শক্ত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
শাকিল হোসেনের প্রত্যাশা, ক্রিকেটের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কালীগঞ্জের তরুণদেরও খেলাধুলায় আগ্রহী করে তোলা সম্ভব হবে।
মুনশুরপুরের আশ্রাফ আলী ও রোকছানা বেগমের কনিষ্ঠ সন্তান শাকিলের সামনে তাই নতুন আসর শুধু আরেকটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি নিজের সামর্থ্য তুলে ধরার আরও একটি সুযোগ। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে টেপবল বিপিএল পর্যন্ত তাঁর পথচলা বলে দেয়, ক্রিকেটে পরিচিতি তৈরির জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, অভিজ্ঞতা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা।
কালীগঞ্জের ‘এক্সপ্রেস’ এবার কোন গতিতে এগোবেন, তার উত্তর মিলবে টেপবল বিপিএলের মাঠে।
এফএস