সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং রোগীদের ভোগান্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করে অনিয়মের চিত্র দেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অসন্তোষ প্রকাশ এবং তাঁর নির্দেশে এক চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করে চিকিৎসকদের উপস্থিতি, সেবার মান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা যাচাইয়ের উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি। তবে এসব পদক্ষেপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকদের একটি অংশের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।
গত ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখতে পান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের নিজ কক্ষে ধূমপান করতে দেখা যায় সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে। কক্ষের অপরিচ্ছন্নতা দেখেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তাঁর নির্দেশে ওই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপের পর সরকারি হাসপাতালে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেওয়া উদ্যোগগুলো কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক কাঠামো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
এর আগে গত ৭ মার্চ নরসিংদীর পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরে ২৬ জুলাই সাতক্ষীরার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে দুই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন তিনি।
এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অবস্থান হিসেবে উঠে এসেছে-সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এর মূল লক্ষ্য সরকারি হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট মহলে মতপার্থক্যের কথাও আলোচনায় এসেছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতসহ সংশ্লিষ্টদের সমালোচনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতাল পরিদর্শন ও স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে তা কীভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তিও জরুরি। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে প্রশাসনিক জবাবদিহির পাশাপাশি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও বজায় থাকবে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে শুধু আকস্মিক পরিদর্শন কিংবা সাময়িক বরখাস্ত যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ বজায় রাখা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এসব সমস্যার প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক বা প্রয়োজনীয় জনবলের অনুপস্থিতি, ওষুধের সংকট কিংবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে রোগীদের ভোগান্তি বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। ফলে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি নাগরিকদের মৌলিক সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক পদক্ষেপের তাৎপর্য এখানেই যে, সরকারি হাসপাতালে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কোনো একক মন্ত্রণালয় বা ব্যক্তির উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। বরং এটি সরকারের সামগ্রিক জবাবদিহি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ বাধা সৃষ্টি করছে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান প্রয়োজন। অনুমান কিংবা অসমর্থিত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী না করে প্রশাসনিক দুর্বলতা, সমন্বয়হীনতা ও অনিয়মের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করাই হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, হাসপাতাল পরিদর্শন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অংশে পরিণত করা। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, রোগীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালের সেবার মান নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কতটা কার্যকর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে পারবে?
কারণ, হাসপাতাল পরিদর্শন কিংবা সাময়িক বরখাস্তই শেষ কথা নয়। সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা কার্যকর থাকছে কি না এবং স্বাস্থ্যসেবার মানে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি ঘটছে কি না-তার ভিত্তিতে।
-টিএস