দেশে ডেঙ্গু ও হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ এবং সরকারি স্বাস্থ্য কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে মেডিসিন ক্লাবের সদস্যদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞান, মানবিক মূল্যবোধ ও স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।
গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজে অনুষ্ঠিত মেডিসিন ক্লাবের ২৭তম কেন্দ্রীয় বার্ষিক সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দক্ষ চিকিৎসক তৈরির পাশাপাশি মানবিক, দায়িত্বশীল ও সেবাপরায়ণ চিকিৎসক গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মেডিসিন ক্লাবের মতো ছাত্রসংগঠনগুলো চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম তাঁর বক্তব্যে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং টিকাদান কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাশিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার এবং কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে পারেন।
অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান কেবল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা সৃষ্টি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াও চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মানবসেবার এই বৃহত্তর দর্শন ধারণ করেই মেডিসিন ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের একাডেমিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে আসছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মেডিসিন ক্লাবের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজভিত্তিক শাখা নিজ নিজ ক্যাম্পাস, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিপৎসংকেত, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম। তাঁর মতে, টিকাদান সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, অভিভাবকদের সঠিক তথ্য জানানো এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের অভিভাবকদের টিকাদান কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে মেডিসিন ক্লাবের সদস্যরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে মেডিসিন ক্লাবের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, তামাক নিয়ন্ত্রণ, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংগঠনটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে সমন্বিতভাবে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়বে। একই সঙ্গে চিকিৎসাশিক্ষার্থীরাও দেশের বাস্তব স্বাস্থ্যসমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের শুধু ক্লিনিক্যাল জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না; নেতৃত্ব, গবেষণা, দলগত কাজ, ব্যবস্থাপনা, পেশাগত নৈতিকতা এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণের ক্ষেত্রেও দক্ষ হতে হবে। মেডিসিন ক্লাবের সেমিনার, বৈজ্ঞানিক আলোচনা, গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম ও সামাজিক সেবামূলক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের এসব গুণ বিকাশে সহায়তা করতে পারে।
মেডিসিন ক্লাবের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ, কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার, শিক্ষক ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান এবং কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, স্বেচ্ছায় রক্তদানের নেটওয়ার্ক, কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতা এবং আন্তমেডিকেল কলেজ গবেষণা উদ্যোগকে শক্তিশালী করা গেলে সংগঠনটির সামাজিক অবদান আরও বিস্তৃত হবে।
অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করেন, মেডিসিন ক্লাবের সদস্যরা নিজেদের জ্ঞান, তারুণ্য, মানবিকতা ও স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। চিকিৎসাশিক্ষা ও মানবসেবার মধ্যে শক্তিশালী সেতুবন্ধ গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল চিকিৎসকসমাজ গঠনে মেডিসিন ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
আরএন