আজ ১৩ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি রোধ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সহনশীলতা শুরু হোক ঘর থেকেই’। নিরাপদ আবাসন, ঝুঁকিসহিষ্ণু অবকাঠামো এবং পরিবারভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের প্রতিপাদ্যে।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে ১৩ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানো এবং নিরাপদ বসতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, বজ্রপাত ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ নিয়মিতভাবে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে। উপকূলীয় অঞ্চল, হাওরাঞ্চর, নদীতীরবর্তী এলাকা এবং পাহাড়ি জনপদে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ সময় দুর্যোগজনিত মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় এ ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকেন। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধি উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দেয়। এসব দুর্যোগে ঘরবাড়ি, ফসল, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি হয়; ব্যাহত হয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রম এবং উদ্ধার ও ত্রাণব্যবস্থায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির মাধ্যমে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করা এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৫-২০৩০ সময়কালের জন্য বহুমাত্রিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদারে একটি জাতীয় রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। এতে আবহাওয়া ও বন্যার পূর্বাভাস উন্নত করা, সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং দুর্যোগের আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই ঘরবাড়ি ও পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব রয়েছে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা গবাদিপশু ও সম্পদ ফেলে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে নিরাপদ স্থানে যেতে দেরি করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু, প্রবীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো দুর্যোগে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিকল্পিত বসতি নির্মাণ, ভবন নির্মাণবিধি কার্যকর করা, নদী ও বাঁধের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মহড়া, সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে শক্তিশালী করতে হবে।
পরিবার পর্যায়েও দুর্যোগ প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি যোগাযোগের নম্বর, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, টর্চলাইট ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা থাকা দরকার। আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম প্রস্তুতি, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর সতর্কবার্তা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের মূল বার্তাও তাই -নিরাপদ পরিবার, সহনশীল অবকাঠামো ও সচেতন জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার মাধ্যমেই দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে।
এফএস