নানা অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে লক্ষ্মীপুরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্পনগরীতে গড়ে ওঠেনি আশানুরূপ শিল্পকারখানা। মেঘনাপাড়ের এ জনপদে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠার ২৯ বছর পরও নানা সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্লট বরাদ্দ নিয়েও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারেনি। অথচ উপকূলীয় এ জনপদে রয়েছে সস্তা শ্রম, দেশের ২১ জেলার সঙ্গে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা এবং ব্যাপক কৃষিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা। বিসিক শিল্পনগরীতে পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি বদলে যেতে পারে এ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
এদিকে বিসিক শিল্পনগরীতে গ্যাস ও পানির সংকট, অভ্যন্তরীণ সড়কে খানাখন্দ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, লোডশেডিং, বাতিহীন ল্যাম্পপোস্ট, নিরাপত্তাপ্রাচীর ও নিরাপত্তাকর্মীর অভাব উদ্যোক্তাদের অন্যতম সমস্যা। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাঞ্চানগর এলাকায় ১৬ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে শিল্পায়নের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়। ২০০০ সাল থেকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়। তিন ধাপে ৫৪টি শিল্প ইউনিটের অনুকূলে ৯৯টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে এর মধ্যে প্রায় ৩০টি শিল্প ইউনিট চালু রয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-রায়পুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বিসিক শিল্পনগরীটি সহজে চেনার উপায় নেই। কারণ, মূল ফটকে নেই কোনো প্রবেশদ্বার বা সীমানাপ্রাচীর। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে কয়েকটি বড় গর্ত, যেখানে জমে আছে পানি। অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যাও প্রকট। সড়কে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত থাকায় মালামাল পরিবহনের সময় ট্রাক, পিকআপ ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনকে চলতে হয় ঝুঁকি নিয়ে। চারদিকে ধুলাবালির ছড়াছড়ি। ড্রেনে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনায় মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে। বর্ষাকালে ও সামান্য বৃষ্টি হলেই শিল্পনগরীর ভেতরে হাঁটুপানি জমে থাকে। এ ছাড়া সীমানাপ্রাচীর না থাকায় চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের আশঙ্কা রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন নারী শ্রমিকেরাও।
এ শিল্পনগরীতে উল্লেখযোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অয়েল মিল, বেকারি, চকলেট তৈরির কারখানা, সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, অটোরাইস মিল ও মবিল রিপ্যাকিং মিল।
আব্দুর রহমান নামে এক কারখানার মালিক বলেন, “বিসিক শিল্পনগরীর রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা এখানকার অব্যবস্থাপনার একটি বড় উদাহরণ। সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় কারখানায় মালামাল আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একই সঙ্গে শিল্পনগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাও খুবই খারাপ। বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। পয়োনিষ্কাশনেরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে আমরা এখানে নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছি।”
মিতালি বেকারির কর্মচারী আবদুল কুদ্দুস বলেন, “শিল্পনগরীর যাতায়াতব্যবস্থা খুবই খারাপ। সড়কের কিছু অংশ নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে সংস্কার করা হলেও কিছুদিন পরই তা আবার ভেঙে যায়। মাঝেমধ্যে সংস্কার করা হলেও তা টেকসই হয় না। ফলে এখানকার ব্যবসায়ীদের নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়তে হয়।”
ভাইয়া গ্রুপের অ্যাডমিন বেলাল হোসেন বলেন, “শিল্পনগরীর ড্রেনগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। ড্রেনগুলোতে পানি জমে থাকে, কিন্তু তা নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার ও জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এত বড় একটি শিল্পনগরীর অবস্থা এভাবে থাকতে পারে না। একই সঙ্গে যাতায়াতব্যবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। একটি কারখানা থেকে আরেকটি কারখানায় মালামাল পরিবহন করতেও আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়।”
এসব সমস্যা সমাধানে আশার কথা শুনিয়েছেন লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. জুয়েল চৌধুরী।
তিনি বলেন, “আমরা একটি প্রধান ফটক নির্মাণের জন্য আবেদন করেছি। গত দুই অর্থবছরে আমাদের সড়কের বেশ কিছু কাজ হয়েছে। আশা করি, আগামী দুই অর্থবছরে আরও কাজ হলে সড়কের সমস্যার সমাধান হবে। এ ছাড়া নিজস্ব ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের কাজ চলছে। পৌরসভার উদ্যোগে একটি ড্রেন নির্মাণের কাজও শেষের দিকে। অন্যদিকে, সড়কবাতি স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের জন্যও আমরা আবেদন করেছি। আগামী দুই অর্থবছরের জন্য আমরা যে প্রাক্কলন দিয়েছি, তা বাস্তবায়িত হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি, যাতে তাঁরা শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে পারেন। পাশাপাশি যাঁরা প্লট বরাদ্দ নিয়েও এখনো কাজ শুরু করতে পারেননি, তাঁদেরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
আরএইচ/আরএন