বাংলাদেশের অনলাইন ফুড ডেলিভারি ও ই-কমার্স খাতে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তির ন্যায্যতা এবং আইন মেনে পরিচালিত হওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে ফুডপান্ডা বাংলাদেশকে ঘিরে সরবরাহকারীর পাওনা নিয়ে বিরোধ, ভ্যাটসংক্রান্ত অভিযোগ এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক চর্চা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাফল্য সাধারণত গ্রাহকসংখ্যা, সেবার গতি ও বাজার সম্প্রসারণ দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার স্থায়িত্ব নির্ভর করে সরবরাহকারী, রেস্তোরাঁ, কর্মী, গ্রাহক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক কতটা স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য, তার ওপরও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ব্যবসায় দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা তৈরি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষের আর্থিক স্বার্থ নয়, প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ব্যবসায়িক আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, ‘প্রোটিন অ্যান্ড পারিশেবল’-এর মালিক শিহাব মাহমুদ বশির ২০২২ সালের ২৩ জুন থেকে ফুডপান্ডার সহযোগী প্রতিষ্ঠান পান্ডামার্টে শাকসবজি ও ফল সরবরাহ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে পাওনা পরিশোধে অনিয়ম, সরবরাহ করা পণ্যের মূল্যের তুলনায় কম অর্থ স্থানান্তর এবং কিছু নথিতে স্বাক্ষর ও ‘রিটার্ন টু ভেন্ডর’ স্লিপ ব্যবহার করে পাওনা আটকে রাখার অভিযোগ তোলেন তিনি।
সরবরাহকারীর অভিযোগে পাওনা হিসাব, পণ্য ফেরত এবং স্বাক্ষরসংক্রান্ত অনিয়মের প্রশ্ন ওঠায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা শুধু নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পণ্য গ্রহণ, ফেরত, বিল অনুমোদন, পাওনা সমন্বয় এবং অর্থ পরিশোধের প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর অংশ।
বিশেষ করে বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক লেনদেন হওয়ায় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে- সরবরাহকারীর পাওনা নিয়ে বিরোধ হলে তা নিষ্পত্তির জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে, পণ্য ফেরতের নথি কীভাবে যাচাই করা হয় এবং হিসাবের অমিল শনাক্ত হলে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ?
প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহকারীর পাওনা নিয়ে বিরোধের সূত্রে ফুডপান্ডা বাংলাদেশের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের আগাম জামিন পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুডপান্ডাকে ঘিরে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার ভ্যাটসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। অভিযোগে বিক্রির হিসাব, সেবার শ্রেণিবিন্যাস, ভ্যাট, ভাড়ার ওপর ভ্যাট এবং উৎসে কর কর্তনের মতো বিষয় থাকার কথা বলা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, এমজিএইচ রেস্টুরেন্টস প্রাইভেট লিমিটেডের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন ফুডপান্ডাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে রেস্তোরাঁগুলোর চুক্তি বাধাগ্রস্ত না করার নির্দেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো রেস্তোরাঁ ও গ্রাহকের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে ব্যবসার সুযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু কোনো প্ল্যাটফর্মের চুক্তির শর্ত যদি রেস্তোরাঁর অন্য সেবাদাতার সঙ্গে কাজ করার স্বাধীনতা সীমিত করে, তবে তা বাজারে প্রতিযোগিতা ও নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশের সুযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুডপান্ডাকে ঘিরে একের পর এক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, সরবরাহকারীদের পাওনা নিয়ে আইনি বিরোধ, ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের জরিমানার ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এসব ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সংকট নয়; বরং এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ ভোক্তা, রেস্তোরাঁ মালিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, সরবরাহকারী এবং ফুডপান্ডার ওপর নির্ভরশীল হাজারো ব্যবসায়ীর আস্থা ও স্বার্থের ওপর। যে প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে অসংখ্য ব্যবসা পরিচালিত হয় এবং গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়, সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বারবার এমন অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।