সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের চালের বাজারে। রাজধানীর খুচরা বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে সরু ও মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চাল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মোকামে ধানের চড়া দামের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের কারণে পরিবহন খরচ বহুলাংশে বেড়ে যাওয়ায় চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর পড়েছে নিত্যপণ্যের বাড়তি খরচের বড় চাপ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও এলাকার বাজার ঘুরে চালের এমন চড়া দামের চিত্র দেখা গেছে।
বাজারের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল কেজিপ্রতি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭২ টাকা। রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ১৯৬৫ টাকায় (কেজিতে ২ টাকা বৃদ্ধি) এবং মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৭৬ টাকা কেজিতে।
নাজিরশাইল চালের দামও এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে বর্তমানে মানভেদে ৭০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। পাশাপাশি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকা মাঝারি মানের পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায়। তবে নিম্নবিত্তের মোটা চালের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে, যা কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে ট্রাকভাড়া ও সার্বিক পরিবহন খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে চালের মিল (রাইস মিল) এবং পাইকারি মোকাম হয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক ধাপে পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। এর প্রতিটি স্তরে যাতায়াত খরচ বাড়ায় প্রভাব পড়েছে খুচরা চালের মূল্যে।
কাজীপাড়া এলাকার চাল বিক্রেতা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পাইকারি বাজার থেকেই আমাদের বাড়তি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। সরু চালের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ক্রেতারা দোকানে এসে দাম শুনে কেনাকাটা কমিয়ে দিচ্ছেন; অনেকে মিনিকেটের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম দামি চালে চলে যাচ্ছেন। পরিবহন ভাড়া ও ধানের দাম না কমলে চালের বাজার সহজে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।”
অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এমনিতে সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি, তার ওপর চালের মতো স্পর্শকাতর পণ্যের দাম বৃদ্ধি জীবনযাত্রায় নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
মিরপুর-৬ এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী শাহিন আলম বলেন, “চালের দাম হঠাৎ করে কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সংসারের নির্দিষ্ট মাসিক বাজেট সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাল কিনতে বাড়তি টাকা চলে যাওয়ায় অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় কাটছাঁট করা ছাড়া উপায় নেই।”
কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহাতাব উদ্দিনের মতে, বাজার তদারকির অভাবে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে অসাধু সুযোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে নিয়মিত তদারকি জোরদার করার দাবি জানান তিনি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট কিংবা সুযোগসন্ধানী দাম বৃদ্ধি রোখাতে ধানের ক্রয়মূল্য, রাইস মিল পর্যায়ের উৎপাদন খরচ, প্রকৃত পরিবহন ব্যয় এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়মূল্য সূক্ষ্মভাবে তদারকি করা জরুরি। সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থার প্রতি স্তরে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এসএ