হিমালয় থেকে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালের বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ বসতি গড়ে তোলাই এখন দেশটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে প্রায় ৪৭৪ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট হিমালয়ের একটি বরফস্তর ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা চীন-নেপাল সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন নদী অববাহিকায় আঘাত হানে। প্রবল পানির ঢল রাশুয়া, নুয়াকোট, ধাদিংসহ বিভিন্ন জেলার জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নেপাল ও তিব্বতে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১৬ লাখ মানুষ।
নেপাল সরকারের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচটি জেলার ১৫টি শহর ও জনপদ ধ্বংস হয়েছে। হাজার হাজার বাড়িঘর, ১৮টি বিদ্যালয়, সাতটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপাসনালয়, হোটেল, বাজার, সড়ক, সেতু ও সরকারি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে অথবা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত জনপদ
মধ্য নেপালের ত্রিশূলী ও তাদি নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত দেবীঘাট একসময় মন্দির, ধর্মীয় মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্য পরিচিত ছিল। বন্যায় শহরটির প্রায় ৩০০ বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। রঙিন বাড়িঘরের অর্ধেকের বেশি ভেসে গেছে। একসময় স্বচ্ছ পানির ত্রিশূলী নদী এখন ঘোলা ও বাদামি পলিতে ভরা।
নদীর তীরে বসবাসকারী এক পরিবারের তিনতলা পাকা বাড়ি ও রেস্তোরাঁ কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যায়। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে আগের বাড়িটি হারানোর পর পরিবারটি নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছিল। এবারের বন্যায় সেটিও পলির নিচে চাপা পড়েছে।
পরিবারের ১১ সদস্য উঁচু স্থানে পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেও তাঁদের সব সম্পদ হারিয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়ে কমিউনিটি রান্নাঘরের খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। নদীর তীরে আবার বাড়ি নির্মাণ করতে তাঁরা ভয় পাচ্ছেন। সরকারি সহায়তায় নিরাপদ জায়গায় পুনর্বাসিত হওয়ার আশা করছেন।
একই এলাকার আরেক বাসিন্দার তিনতলা বাড়ির ওপরের দুটি তলা ভেসে গেছে। তাঁর ফার্মেসির ওষুধসহ অন্যান্য সম্পদের ক্ষতি মিলিয়ে আর্থিক লোকসান ৭০ লাখ নেপালি রুপির বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। চার দশক ধরে সেখানে বসবাস করলেও এমন ভয়াবহ বন্যা তিনি কখনো দেখেননি।
পুনর্গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পুনর্গঠনে প্রায় ৪৭৪ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
বর্তমানে ধ্বংসস্তূপ সরানো, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থা পুনরায় চালু করা এবং সাময়িকভাবে সড়ক মেরামতের কাজ চলছে। সরকার দেড় মাসের মধ্যে দুর্যোগ-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ চাহিদা মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তবে পুনর্গঠনের অর্থ শুধু বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মাণেই ব্যয় হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কর্মসংস্থান, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবন পুনরুদ্ধার করাও জরুরি।
ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বরফস্তর ধসে পড়া এলাকায় এখনো বিপদের ঝুঁকি রয়েছে। হিমবাহ গলে যাওয়া, উন্মুক্ত শিলাস্তর এবং পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন করে ধস ও বন্যা হতে পারে। তাই আগের জায়গায় বসতি পুনর্নির্মাণের পরিবর্তে নিরাপদ এলাকায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কিন্তু নদীর কাছ থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়। কারণ নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে রয়েছে মহাসড়ক, বাজার, বাণিজ্যপথ ও উর্বর কৃষিজমি। এসব জায়গা থেকে দূরে গেলে মানুষের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নতুন বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
চীন সীমান্তের কাছে অবস্থিত স্যাব্রুবেসি গ্রামটি একসময় হিমালয়ে ট্রেকিং ও তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বন্যায় গ্রামটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেখানকার অনেক পরিবার স্বজন হারিয়েছে। কেউ কেউ স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের হারিয়ে এখন অন্যদের সঙ্গে অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও নতুন বন্যার ভয় তাঁদের তাড়া করছে।
এর আগে ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত অনেক পরিবারও স্থায়ী পুনর্বাসন পায়নি। ধাদিং জেলার একটি অস্থায়ী বসতিতে আশ্রয় নেওয়া কয়েক শ পরিবার এবারের বন্যায় আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাটি আগেই বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় পরিবারগুলো সেখানেই রয়ে গিয়েছিল।
আগের দুর্যোগের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অর্থ পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়েন ক্ষতিগ্রস্তরা। অনেক পরিবার পর্যাপ্ত ঋণ বা সহায়তা না পেয়ে ছোট বাড়ি নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে আরও আর্থিক সংকটে পড়েছে। এবার পুনর্বাসনের পরিকল্পনায় এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
যোগাযোগ ও পর্যটনে বড় ক্ষতি
বন্যায় কাঠমান্ডু থেকে চীন সীমান্ত পর্যন্ত প্রধান সড়কের প্রায় ৬৯ কিলোমিটার অংশ ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩টি যানবাহন চলাচলযোগ্য সেতু এবং ৫৩টি পদচারী সেতু। এতে সীমান্তবাণিজ্য, পরিবহন ও পর্যটন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
দেবীঘাটে সেতু ভেঙে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দাকে অস্থায়ী জিপলাইনের সাহায্যে ত্রিশূলী নদী পার হতে হচ্ছে। প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ এই তারের ব্যবস্থায় ধাতব খাঁচায় বসে নদী পারাপার করতে হয়। ফলে চিকিৎসা, বাজার ও কর্মস্থলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর দেশটিতে ট্রেকিং ও তীর্থযাত্রার ব্যস্ত মৌসুম। কিন্তু ভূমিধসের কারণে লাংটাং উপত্যকা ও মাউন্ট কৈলাসের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বহু পর্যটক ভ্রমণ বাতিল করেছেন।
ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ খাতে অন্তত দুই লাখ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান রয়েছে। মৌসুমি কাজে আরও প্রায় ৫০ হাজার গাইড, সহকারী গাইড ও মালবাহক যুক্ত থাকেন। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় এসব মানুষের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান স্থলপথ রাশুয়া-গিয়েরং সীমান্তপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিকল্প পথগুলো ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বড় পরিমাণ পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। ফলে বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে সড়ক ও সীমান্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ জরুরি।
জলবিদ্যুৎ খাতেও বিপর্যয়
নেপালের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৯৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎনির্ভর। দেশটি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করে বছরে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করে। কিন্তু এবারের বন্যায় ত্রিশূলী নদী অববাহিকার ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চালু ও নির্মাণাধীন প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশটির মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ। দেবীঘাটের ৪২ বছর আগে চালু হওয়া একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
এসব প্রকল্প পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থের পাশাপাশি প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকটি প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শত শত কর্মী আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে জলবিদ্যুৎনির্ভর রপ্তানি কৌশলের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও আগাম সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক উষ্ণায়নে হিমবাহ সরে যাচ্ছে এবং পাহাড়ের পাথরের ফাটলে জমে থাকা বরফ ও চিরহিমায়িত মাটি গলে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পও সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করে থাকতে পারে।
বন্যার দিন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের কাছে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার এসএমএস পাঠানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সতর্কবার্তায় বন্যার সম্ভাব্য গতি ও ব্যাপকতা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য ছিল না। তাছাড়া পানির তোড়ে স্বয়ংক্রিয় নদী পর্যবেক্ষণব্যবস্থার অনেক যন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সময়মতো সতর্কতা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এখন হিমবাহের হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যার পাশাপাশি পাথর ও বরফের ধস, চলমান হিমবাহ এবং ভূমির স্থানচ্যুতির ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। উচ্চঝুঁকির এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে বসতি ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সহায়তা অপরিহার্য
পুনর্গঠনের বিপুল ব্যয় মেটাতে নেপাল আন্তর্জাতিক অনুদান সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যাতে নতুন ঋণের বোঝা না বাড়ে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও দেশটি বারবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। তাই পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নত প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের সামনে এখন শুধু ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর ও সেতু ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল জনপদ গড়ে তোলার দায়িত্বও রয়েছে। এবারের বন্যা সেই প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি নিরাপদ পুনর্বাসন, জীবিকা পুনরুদ্ধার, উন্নত আগাম সতর্কীকরণ এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ছাড়া এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
সূত্র: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস / এফএস