দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে তীব্র হচ্ছে। দ্বীপপুঞ্জের তেলসম্পদ আহরণ বন্ধে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারের তৎপরতা এবং মৎস্য খাতের ওপর সম্ভাব্য বিধিনিষেধ আরোপের হুমকিতে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। চার দশকেরও বেশি সময় আগে সংঘটিত যুদ্ধের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো দ্বীপবাসীরা বলছেন, তাঁরা নিজেদের মতো করে শান্তিতে থাকতে চান।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মানুষ বসবাস করেন। ১৯৮২ সালের যুদ্ধে দ্বীপপুঞ্জটি পুনর্দখলে নেয় যুক্তরাজ্য। এরপর চার দশকে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দ্বীপপুঞ্জটি এখন মূলত মৎস্যসম্পদ, পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে।
দ্বীপটির মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২০২৫ সালে প্রায় ৮৫ হাজার পাউন্ডে পৌঁছেছে। তবে নতুন করে তেল উত্তোলন নিয়ে বিরোধ এবং আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক চাপ দ্বীপপুঞ্জের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
তেলসম্পদ ঘিরে নতুন বিরোধ
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত সি লায়ন তেলক্ষেত্র নিয়ে দুই দেশের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান নাভিটাস পেট্রোলিয়াম ও ব্রিটিশ অংশীদার রকহপার এক্সপ্লোরেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ২০২৮ সালের দিকে তেল উৎপাদন শুরু হতে পারে।
স্বাধীন বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এই তেলক্ষেত্রের উৎপাদন দ্বীপপুঞ্জের জিডিপি তিন গুণ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নরওয়ের আদলে একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আর্জেন্টিনা এই প্রকল্পকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক সম্পদের অধিকারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। দেশটির সরকার প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আর্জেন্টিনার অনুমোদন ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছে।
আর্জেন্টিনা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক ট্রাইব্যুনালের কাছে সি লায়ন প্রকল্পের তেল উত্তোলন বন্ধে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অবস্থান, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নির্বাচিত সরকারের অনুমোদনে পরিচালিত প্রকল্পটি বৈধ এবং দ্বীপবাসীদের নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার রয়েছে।
আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক চাপের কারণে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত দুটি বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি সরে দাঁড়িয়েছে। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী তেল উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মৎস্যসম্পদই অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে স্কুইডসহ সামুদ্রিক মাছ আহরণ। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাজ্য দ্বীপপুঞ্জের জন্য ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচেটিয়া মৎস্য আহরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়। এরপর লাইসেন্স বিক্রির মাধ্যমে স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মাছ ধরার নৌযানগুলো সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।
এই খাত থেকে বিপুল রাজস্ব আয় হয়েছে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্কুইডের পরিমাণ কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মাছের মজুত কমে গেলে দ্বীপপুঞ্জের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
স্থানীয় মৎস্য খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে গবেষণাও চলছে। তেল উত্তোলনের পাশাপাশি মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্ব রক্ষা করা দ্বীপপুঞ্জের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। এর জবাবে যুক্তরাজ্য সামরিক অভিযান চালায়। প্রায় ১০ সপ্তাহের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সামরিক সদস্য এবং দ্বীপপুঞ্জের তিনজন বাসিন্দা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
যুদ্ধের পরও দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা রয়ে গেছে। দ্বীপপুঞ্জের অনেক বাসিন্দার কাছে বর্তমান বিরোধ শুধু ভূখণ্ড বা অর্থনীতির প্রশ্ন নয়; এটি তাঁদের নিরাপত্তা, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়।
ফকল্যান্ড সরকারের প্রধান নির্বাহী আন্দ্রেয়া ক্লজেন যুদ্ধের সময় শিশু ছিলেন। তিনি জানান, আর্জেন্টিনার সেনাদের আগমন এবং ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানের হামলার স্মৃতি এখনো তাঁকে তাড়া করে ফেরে। যুদ্ধের পর থেকে দ্বীপপুঞ্জ আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়েছে, যদিও প্রতিরক্ষার জন্য এখনো যুক্তরাজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
দ্বীপপুঞ্জের আইনসভার সদস্য ডট গোল্ডের মতে, ১৯৮২ সালের পর বর্তমান পরিস্থিতি তাঁদের জন্য সবচেয়ে গুরুতর সময়গুলোর একটি। তবে চাপের মুখেও তাঁরা নিজেদের জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মিলেইয়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ফকল্যান্ড প্রশ্নে তাঁর সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। আর্জেন্টিনায় দ্বীপপুঞ্জটি ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত এবং দেশটির রাজনীতিতে এর সার্বভৌমত্বের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
১৯৯০-এর দশকে আর্জেন্টিনা দ্বীপবাসীদের মন জয় করার কৌশলও নিয়েছিল। সে সময় শিশুদের জন্য জনপ্রিয় অ্যানিমেশন ‘পিংগু’র ভিডিও পাঠানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার কোনো সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন কমে গেলে দ্বীপপুঞ্জের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাধীনতা ও পরিচয় রক্ষায় অনড় দ্বীপবাসীরা
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের জনসংখ্যা গত কয়েক বছরে বেড়েছে। সেখানে প্রায় ৭০টি দেশের মানুষ বসবাস করেন। ভালো বেতন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং তুলনামূলক কম করের কারণে বিদেশিরাও সেখানে আকৃষ্ট হচ্ছেন। দ্বীপপুঞ্জের অর্থনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।
তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার জটিল চিকিৎসার জন্য অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের দক্ষিণ আমেরিকায় নিয়ে যেতে হয়। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও স্বনির্ভরতা ধরে রাখতে চান।
দ্বীপপুঞ্জের আইনসভার সদস্য স্টেসি ব্র্যাগার বলেন, ফকল্যান্ডবাসীদের পরিচয় ব্রিটিশ হলেও তাঁদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা, সম্পদশীলতা ও দৃঢ়তাই তাঁদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সব মিলিয়ে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে সার্বভৌমত্ব, তেল ও মৎস্যসম্পদের অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ। সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তুলনামূলক কম হলেও অর্থনৈতিক চাপ ও আইনি লড়াই দ্বীপপুঞ্জের স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাজ্য-আর্জেন্টিনা সম্পর্ককে নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
এফএস