বন ও পরিবেশ সুরক্ষা, বনভূমি দখলমুক্তকরণ, বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বন বিভাগের সেবা পৌঁছে দেওয়ার দাবিতে গাজীপুরে পৃথক বন বিভাগ প্রতিষ্ঠাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে গাজীপুর পরিবেশ আন্দোলন (গাপা) ও জনস্বার্থ উন্নয়ন ট্রাস্ট (PID Trust)।
মঙ্গলবার দুপুরে জয়দেবপুরের শহীদ নিয়ামত সড়কের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে জনস্বার্থ উন্নয়ন ট্রাস্টের ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও সিইও মো. মেহেদী হাসান এসব দাবি জানান।
তিনি বলেন, গাজীপুরে, ঢাকা বন বিভাগের ৯৩৪.৭৪ একর বনভূমি রয়েছে, গাজীপুর বনবিভাগের ৬৫১৭৩.২১ একর বনভূমি রয়েছে। ঢাকা বন বিভাগের জবরদখলকৃত ভূমি ৬০৮৬.৮৪ একর, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের জবরদখলকৃত ভূমি ১৬৭৯.৮১ একর। ঢাকা বন বিভাগের জবরদখলকৃত ১৪৫৫৫ জন বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের জবরদখলকৃত ২৬৫ জন বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হয়রানি মূলক মামলা রয়েছে প্রায় ৬ হাজার।
তিনি বলেন, গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলসমৃদ্ধ জেলা। জেলার বনভূমি পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বনভূমি জবরদখল, অবৈধ স্থাপনা, বন উজাড় ও বিভিন্ন ধরনের বন অপরাধের কারণে গাজীপুরের বন ও পরিবেশ ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, শুধু আইন ও নীতিমালা থাকলেই বন রক্ষা সম্ভব নয়। এ জন্য কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, দ্রুত আইন প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের সহজে সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকা বন বিভাগ এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত। অথচ এ দুই বিভাগের সম্পূর্ণ অধিক্ষেত্র গাজীপুর জেলার মধ্যে। ফলে বন ও পরিবেশ-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা, আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাজে গাজীপুরের সেবাপ্রত্যাশীদের ঢাকায় গিয়ে যোগাযোগ করতে হয়।
এতে সাধারণ জনগণ, বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা, ভূমির মালিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সেবাপ্রত্যাশীদের সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
আয়োজকরা বলেন, ঢাকা বন বিভাগের ভবিষ্যৎ কাঠামো কী হবে, সেটি তাদের দাবির বিষয় নয়। তাদের মূল দাবি হলো, গাজীপুর জেলার বনাঞ্চল ও বন প্রশাসনের জন্য পৃথক ‘গাজীপুর বন বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করা।
তাদের মতে, পৃথক বন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হলে বিভাগীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক সেবা গাজীপুর থেকেই পাওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি বন সংরক্ষণ, বনভূমি দখল প্রতিরোধ ও উদ্ধার, বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বন বিভাগের সমন্বয় আরও কার্যকর হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—সেবা সহজীকরণ ও বন-পরিবেশ সুরক্ষায় অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী ‘গাজীপুর বন বিভাগ’ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং গাজীপুরের বন প্রশাসনকে গাজীপুরকেন্দ্রিক করা।
দ্বিতীয় দাবিতে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করে বন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে বন অপরাধের ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে মাঠপর্যায়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
তৃতীয় দাবিতে জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং উদ্ধার করা বনভূমি পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
চতুর্থ দাবিতে যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়রানিমূলক বন মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত বন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
পঞ্চম দাবিতে বন অপরাধে জড়িত সরকারি-বেসরকারি সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, প্রভাব কিংবা অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন গাজীপুর পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি মো. মোছাদ্দিকুর রহমান, গাপা, প্রধান উপদেষ্টা ফেডরিক মুকুল বিশ্বাস, গাপা, নির্বাহীসহ-সভাপতি এনামুল হক, গাপা সহ সভাপতি মো: ইসমাইল মোল্যা, গাপা দপ্তর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রুবেল প্রমুখ।
এএস/আরএন