গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক যেন গতি হারিয়েছে। চার লেনের মহাসড়ক হলেও বিভিন্ন স্থানে বাজার, যত্রতত্র বাস থামানো, পণ্যবাহী গাড়ির সারি, অবৈধ পার্কিং, নিষিদ্ধ তিন চাকার যান ও পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে যানজট। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। প্রভাব পড়ছে গাজীপুরের শিল্পকারখানা থেকে পণ্য পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রমেও।
ভালুকা থেকে গার্মেন্টস পণ্য নিয়ে চট্টগ্রামের একটি কনটেইনার ডিপোর উদ্দেশে রওনা দেওয়া কভার্ডভ্যানচালক মো. ইউসুফের অভিজ্ঞতাই এর উদাহরণ। গাজীপুরের এমসি বাজার এলাকায় যানজটে আধা ঘণ্টার বেশি আটকে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
ইউসুফ বলেন, সাধারণত চট্টগ্রাম পৌঁছাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজটে পড়ায় সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে শিপমেন্ট আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে যানজটে সময় নষ্ট হওয়ার পরও অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাতে হয়। এতে চালকের ক্লান্তি বাড়ে, একই সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে জৈনাবাজার পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। সালনা, পোড়াবাড়ি, মাস্টারবাড়ি, রাজেন্দ্রপুর, বাঘেরবাজার, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর ও জৈনাবাজার এলাকায় বিভিন্ন কারণে যানবাহনের গতি কমে যায়।
কোথাও মহাসড়ক ঘেঁষে বসেছে বাজার। কোথাও যাত্রী ওঠানামার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে দূরপাল্লা ও স্থানীয় বাস। আবার শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহনের জন্য মহাসড়কের পাশে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকে ট্রাক ও কভার্ডভ্যান। অনেক ক্ষেত্রে এসব গাড়ি চলাচলের লেনেও চলে আসে।
ময়মনসিংহের বাসচালক আব্দুল খালেক বলেন, মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক-কভার্ডভ্যানের সারি থেকে মানুষ হঠাৎ মহাসড়কে উঠে পড়ে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিল্পের পণ্য, মহাসড়কে অনিশ্চয়তা
গাজীপুরে ছোট-বড় প্রায় ৫ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রতিদিন তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। রপ্তানির জন্য পণ্য পরিবহন করা হয় চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বন্দর ও কনটেইনার ডিপোর দিকে। একইভাবে কারখানার কাঁচামালও আসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
এই সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। ফলে মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টার যানজটের প্রভাব শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন এবং রপ্তানি কার্যক্রমেও।
পরিবহন চালকেরা জানান, গাজীপুর অংশ পেরোতেই অনেক সময় কয়েক দফা যানজটে পড়তে হয়। ফলে হাতে কয়েক ঘণ্টা সময় রেখেও নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে না।
বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
যানজটের পাশাপাশি মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যান চলাচল নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। দ্রুতগতির বাস, ভারী ট্রাক ও কভার্ডভ্যানের সঙ্গে ধীরগতির এসব যান একই সড়কে চলাচল করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
চালকদের অভিযোগ, যত্রতত্র পার্কিং, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার এবং বাসের অনিয়ন্ত্রিত থামার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কর্মকর্তা জাকিরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে অসঙ্গতি।
তবে তাঁর অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশও স্বীকার করছে ঝুঁকির কথা
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ তো অবশ্যই। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়েই চেষ্টা করছি। খুব সফল হচ্ছি এমনটা বলার সুযোগ নেই। আমরা বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিচ্ছি।’
তিনি জানান, মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবস্থার আওতায় আনার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। পুরো মহাসড়কে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা হলে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ
মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাজার ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর আহমেদ বলেন, জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে জৈনাবাজার পর্যন্ত অংশকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
তিনি জানান, এর মধ্যে দুটি অংশের ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। আরও দুটি অংশের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। অপর একটি অংশের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ মহাসড়কের ওপর বাজার, যত্রতত্র বাস থামানো, নিষিদ্ধ যান চলাচল, পণ্যবাহী গাড়ির লেন দখল এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে পথচারী পারাপার অব্যাহত থাকলে প্রশস্ত সড়কও যানজটমুক্ত ও নিরাপদ রাখা কঠিন।
গাজীপুরের গতি থামলে
গাজীপুরের শিল্পকারখানায় প্রতিদিন উৎপাদন চলছে। তৈরি হচ্ছে রপ্তানিপণ্য, আসছে কাঁচামাল। কিন্তু কারখানা থেকে বের হওয়ার পর সেই পণ্য যখন মহাসড়কে ওঠে, তখনই শুরু হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
একটি যানজট চালকের কাছে হয়তো আধা ঘণ্টার অপেক্ষা। কিন্তু শিল্পের হিসাবে সেই আধা ঘণ্টার মূল্য অনেক বেশি। শিপমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে, বাড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, ব্যাহত হতে পারে সরবরাহব্যবস্থা। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে গিয়ে চালকের ক্লান্তি বাড়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
তাই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সংকট শুধু যানজটের নয়। এটি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি পরিবহন, মানুষের নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনীতির গতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গাজীপুরের শিল্প যদি অর্থনীতির চাকা ঘোরায়, সেই চাকার পণ্য বহনকারী মহাসড়কও সমান গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদ ও গতিশীল করা জরুরি।