ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদের আন্দোলনে সোমবার রাজধানীর সড়কে তৈরি হয় এক বৈপরীত্য। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কয়েক ঘণ্টার অবরোধে যখন ওই এলাকার যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তখন অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় রাজধানীর অন্য অনেক সড়কে দেখা যায় তুলনামূলক ফাঁকা ও স্বাভাবিক গতির যান চলাচল।
সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকেরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কয়েক হাজার চালক সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিলে প্রেস ক্লাব, পল্টন ও আশপাশের এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা মিছিল নিয়ে পল্টনের দিকে চলে যান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও ওই এলাকায় তীব্র যানজট এবং রাজধানীর অন্য অংশে অটোরিকশা চলাচল কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।
তবে অবরোধের এলাকা পেরিয়ে রাজধানীর অন্য সড়কের চিত্র ছিল ভিন্ন। সাধারণ দিনে যেসব সড়কে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা পাশাপাশি চলাচল করে, সেখানে সোমবার অটোরিকশার উপস্থিতি অনেক কম দেখা যায়। ফলে কোথাও কোথাও প্রধান সড়কে যানবাহন তুলনামূলক সহজে চলতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ধীরগতির অটোরিকশা বা হঠাৎ করে প্রধান সড়কে ঢুকে পড়া যান কম থাকায় অন্য যানবাহনের জন্য সড়কে কিছুটা বেশি জায়গা ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিনের এই বৈপরীত্য নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কয়েকজন ফেসবুক ব্যবহারকারী অটোরিকশা কম থাকায় রাজধানীর কিছু সড়কে যান চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিদিনের যানজটের পেছনে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কতটা ভূমিকা রাখে এবং নির্দিষ্ট রুটে এসব যান পরিচালনা করা হলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে কি না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব প্রতিক্রিয়াকে পুরো রাজধানীর যান চলাচলের সামগ্রিক চিত্র হিসেবে দেখা যায় না।
বাস্তবে সোমবারের পরিস্থিতি ছিল একসঙ্গে দুই রকম। প্রেস ক্লাবের সামনে অটোরিকশাচালকদের অবরোধে যাত্রীদের দুর্ভোগ হয়েছে। অন্যদিকে অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় রাজধানীর কিছু এলাকায় সড়কে যানবাহনের গতি ও চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। এ কারণে দিনের ঘটনাটি শুধু একটি পরিবহন ধর্মঘট বা চালকদের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ঢাকার সড়কে বিভিন্ন ধরনের যান কীভাবে একসঙ্গে চলাচল করে, সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেও সামনে এনেছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এসব যান স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নগরবাসীর একটি বড় অংশের চাহিদা পূরণ করলেও প্রধান সড়কে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, ধীরগতিতে চলাচল এবং হঠাৎ লেন পরিবর্তনের কারণে যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে চালকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ জীবিকার উৎস এবং অনেক নিম্নআয়ের যাত্রীর কাছে তুলনামূলক সহজলভ্য পরিবহন।
সরকারও ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবস্থাপনা, নিবন্ধন, ফিটনেস, গ্যারেজ ও চার্জিং স্টেশন এবং চলাচলের রুট নিয়ে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল সীমিত রেখে অভ্যন্তরীণ সড়কে নিবন্ধিত ই-রিকশা চলাচলের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে সোমবারের আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রিকশা আটক, ডাম্পিং ও জরিমানার নামে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। তারা রাজধানীর সব সড়কে অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ দাবি করেছেন। আন্দোলনের সময় চালকদের অবরোধে প্রেস ক্লাব এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন যাত্রীকে রিকশা থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
দিনের অভিজ্ঞতা তাই একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে এনেছে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার সমাধান কি শুধু অটোরিকশা কমিয়ে দেওয়ার মধ্যে, নাকি কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলবে, কোন সময় চলবে এবং কীভাবে চলবে, তার কার্যকর ব্যবস্থাপনায়? সোমবারের সড়কের দুই ধরনের চিত্র অন্তত দেখিয়েছে, যানবাহনের ধরন ও চলাচলের নিয়মের পরিবর্তন সড়কের গতিতে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে। এখন প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যেখানে চালকদের জীবিকা ও যাত্রীদের সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ বজায় রেখেও প্রধান সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায়।
এসএস