সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেমিপাকা ঘর। বেশির ভাগ দরজাই বন্ধ। কোথাও ঘরের সামনে আগাছা, কোথাও পানিতে জমে আছে কাদা। কোনো ঘরের পানির কল নেই, কোথাও নষ্ট ডিপটিউবওয়েল। আবার কোথাও ভেঙে গেছে টয়লেট ও পুকুরের ঘাট। সরকারি অর্থে নির্মিত এসব ঘর এখন অনেকটাই অব্যবহৃত পড়ে আছে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে এমন ১৫২টি ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ৪৬৭টি ঘরের মধ্যে ৩৪৩টিতে পরিবার বসবাস করলেও বাকি ঘরগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি।
সম্প্রতি উপজেলার বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজার, দক্ষিণ চরবংশীর মিয়ারহাট ও হাজিমারা, উত্তর চরবংশীর মদিনাবাজার ও কুচিয়ামারা এবং দক্ষিণ চরআবাবিলের উদমারা এলাকার কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বাংলাবাজার আশ্রয়ণ প্রকল্পে কয়েকটি ঘরের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় তালা ঝুলছে। আশপাশের বাসিন্দারা জানান, কিছু পরিবার ঘর পাওয়ার পর সেখানে নিয়মিত থাকেনি। আবার যারা বসবাস করছেন, তাঁদেরও নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে চলাচলে সমস্যা হয়। বিশুদ্ধ পানির জন্যও ভোগান্তি রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে ডিপটিউবওয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। পানির কল নষ্ট বা চুরি হয়ে যাওয়ায় দূরের স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
দক্ষিণ চরবংশীর মিয়ারহাট ও হাজিমারা এলাকার প্রকল্পগুলোতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। কয়েকটি পুকুরের ঘাট ভেঙে গেছে। পুকুরপাড়ের কিছু ঘরও ঝুঁকিতে রয়েছে। কোথাও টয়লেট নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বাসিন্দাদের কয়েকজন বলেন, আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলোতে নিজস্ব কবরস্থান নেই। পুকুর থাকলেও ঘাটের সংস্কার না হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের পানিতে নামতে সমস্যা হয়। এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিকবার জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বদলে কোনো কোনো কেন্দ্রে এমন ব্যক্তির নাম এসেছে, যাঁদের নিজেদের বসতভিটা ও ঘরবাড়ি রয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদেরও ঘর দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রায়পুরে মোট ৪৬৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৯৪টি ও শিবপুরে ১০টি, কেরোয়ার মীরগঞ্জে ৯টি, দক্ষিণ চরবংশীর মিয়ারহাটে ৪৫টি, হাজিমারায় ৪৪টি ও কারিমিয়ায় ১১৭টি, উত্তর চরবংশীর কুচিয়ামারায় ২৪টি ও মদিনাবাজারে ৪৩টি এবং দক্ষিণ চরআবাবিলের উদমারায় ৭৯টি ঘর রয়েছে।
এর মধ্যে ১৫২টি ঘর বর্তমানে তালাবদ্ধ। বাংলাবাজারে ৪০টি, মিয়ারহাটে ১৪টি, হাজিমারায় ১৪টি, মদিনাবাজারে ১৩টি, কুচিয়ামারায় ৮টি, উদমারায় ১১টি এবং কারিমিয়ায় ৩২টি ঘর খালি রয়েছে।
ঘর বরাদ্দের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ করেছেন দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কোনো কোনো ইউপি সদস্য ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন।
এ ছাড়া ঘরের জায়গা ভরাটের সময় উপকারভোগী পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে মাটি কাটা ও ভরাটের কাজ করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজী বলেন, ঘরের জায়গা ভরাট এবং মেঝে ও বারান্দার কাজের জন্য উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। নিজেদের ঘরের কাজ হওয়ায় অনেকে নিজেরাই শ্রম দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ঘর বরাদ্দের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
উপজেলা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলিল রেজিস্ট্রির খরচ হিসেবে উপকারভোগীদের কাছ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
আশ্রয়ণকেন্দ্রের কয়েকজন বাসিন্দা নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কিছু কেন্দ্রে বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যায়। কোথাও মাদকের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কয়েকজন লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
রায়পুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘরে বর্তমানে কেউ বসবাস করছেন না। এসব ঘর নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ১৫২টি ঘর তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তালিকায় সচ্ছল ব্যক্তির নাম থাকলে তা যাচাই করে বাদ দেওয়া হবে। এরপর প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মধ্যে ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে। আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
সরকারি খাসজমিতে প্রায় ৫০০ বর্গফুট জায়গার ওপর এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে দুটি শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, ইউটিলিটি রুম, টয়লেট ও বারান্দা রয়েছে। দুর্যোগসহনীয় এসব ঘরে সোলার সিস্টেম ও বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য নির্মিত এসব ঘরের একটি অংশ যখন তালাবদ্ধ, আর বসবাসরত পরিবারগুলো পানি, জলাবদ্ধতা, পয়োনিষ্কাশন ও নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যার কথা বলছে, তখন শুধু ঘর নির্মাণ নয় এসব প্রকল্পের উপকারভোগী নির্বাচন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এসএ