যথাযথ পরিবেশ, অবকাঠামোগত সংকট ও প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাবসহ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাংস্কৃতিক অঙ্গন। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণের দাবি থাকলেও এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে এই অঙ্গনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
রাকসু নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রাকসু ভবনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো। কিন্তু নির্বাচনের পর প্রশাসন সেখান থেকে তাদের পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুলে স্থানান্তর করে। যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা, আলো-বাতাস, পানি ও পরিচ্ছন্নতার সংকটে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমসিম খাচ্ছে।
সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, ভবনের বেহাল অবস্থা, সংকীর্ণ কক্ষ, অপর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও সুপেয় পানির সংকটের পাশাপাশি বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়ে পানি পড়ায় বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। এসব কারণে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন মোট ৮ টি সংগঠন সেখানে কক্ষ বরাদ্দ পায়। যার মধ্যে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন, সমকাল নাট্যচক্র, অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার এন্ড এডুকেশন, বাংলাদেশ গণশিল্পি সংস্থা, তীর্থক নাটক, স্বনন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার রাজশাহী রয়েছে।
অন্য সংগঠনগুলোর মধ্যে শিবিরের বিকল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ ও ছাত্রদলের জাসস রয়েছে। এছাড়াও, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, অনুশীলন নাট্যদল তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তবে ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কক্ষগুলো সংকীর্ণ, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে। অনেক জানালা ভাঙা, টিনের চালার অবস্থাও নাজুক। কোথাও কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। পুরো ভবনের ওয়াশরুমগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। নেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা, ইন্টারনেট সংযোগও সীমিত।
রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাসিম আহমেদ বলেন, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সুযোগ-সুবিধা দিন দিন কমছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য এমন পরিবেশ অত্যন্ত দুঃখজনক। বৃষ্টির সময় ভবনের টিন দিয়ে পানি ঢুকে অতিরিক্ত আর্দ্রতায় বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। ছোট কক্ষের কারণে পর্যাপ্ত রিহার্সেলও করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ভবনটিতে পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। লাইটের সমস্যাও নিয়মিত দেখা যায়। এসব সমস্যার কথা বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। ভবনের ভেতর ও সামনের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক রিফাইয়া রাজ্জাক রিফা বলেন, টিএসসিসিতে কার্যালয় হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন আমরা রাকসু ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। রাকসু নির্বাচনের পর আমাদের পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাকসু ভবনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গাও নেই। ফলে নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনায় আমাদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলো ও খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যার পর নারী সদস্যদের জন্যও জায়গাটি অস্বস্তিকর, পাশাপাশি সাপের ভয়ও রয়েছে। সংস্কারের জন্য আবেদন করে উপাচার্যের অনুমোদন পেলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি।
রাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা বলেন, শুরু থেকেই ভবনটি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা একাধিকবার রাকসুর অধিবেশন ও প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সাথে এ বাজেট অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাজেটে রাখা হয়নি , যা অত্যন্ত হতাশাজনক। ভবনটির সংস্কারের দায়িত্ব ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের হওয়ায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত কাজটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও এ বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছে। বিষয়টি সমাধানে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর সপ্তদশবারের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ১২টি প্যানেলের মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি, এজিএসসহ ২০টিতে জয়লাভ করে।
নির্বাচনের আগে এক বছরের মধ্যে ২৪টি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যানেলটি। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণও ছিল। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে রাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা বলেন, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণ একটি বড় প্রকল্প, যা পুরোনো শেখ রাসেল মডেল স্কুল সংস্কারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থের প্রয়োজন। নতুন কয়েকটি হল নির্মাণের জন্য যে বাজেট আসছে, তার সঙ্গে টিএসসিসির বাজেটও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ বর্তমান টিএসসিসি ভবনে জায়গার সংকট থাকায় এটি সম্প্রসারণের সুযোগও নেই। পূর্ণাঙ্গ আবাসিকতার মতো টিএসসিসি নির্মাণের ক্ষেত্রেও একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
রাকসুর মেয়াদ প্রায় শেষ পথে হলেও কাওয়ালি ও ইসলামি সংগীতের অনুষ্ঠান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে রাকসুর বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের অর্থে জামায়াতি মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার বাইরে কিছুই ভাবতে পারেননি। এ কারণেই কাওয়ালি ও ইসলামি সংগীতের অনুষ্ঠান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়নি। সব মত ও পথের শিক্ষার্থীদের ধারণ করতে না পারা শিবির-সমর্থিত প্যানেলের অক্ষমতা। ভবিষ্যতে প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আরও সতর্ক হতে হবে।
তবে এ বিষয়টি অস্বীকার করে রাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা বলেন, এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ। আমি জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কাওয়ালি হয়েছে মাত্র একটি প্রোগ্রামে। অথচ সেটাকে ইস্যু করে ফ্রেমিং করা হচ্ছে।
এসএ