মেহেরপুর শহর থেকে কুষ্টিয়া মহাসড়কে দুই কিলোমিটার দূরে বিস্তীর্ণ খড়ের মাঠ। বর্তমানে শহুরে পরিবেশ গড়ে ওঠার কারণে খড়ের মাঠ আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে। বাংলার ঋতুর রাণী শরতের আগমনে প্রকৃতি নতুন সাজে সজ্জিত হয়। শরতের নীল আকাশে তুলার মতো মেঘ আর কাশবনে কাশফুলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। বিকেলে কাশবনের এক পাশে দর্শনার্থীদের কাশফুলের সঙ্গে ফটোসেশন, আর অন্য পাশে পাখিদের কাশফুলে বিচরণ। এ যেন প্রকৃতিতে মানুষ ও পাখির মিলনমেলা।
এ বছর খড়ের মাঠে কাশফুলের দেখা মিলেছে চার প্রজাতির মুনিয়া পাখি ও এক প্রজাতির বাবুই পাখির। এর মধ্যে ত্রিরঙা মুনিয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি আবাসিক পাখি। একসময় ত্রিরঙা মুনিয়া ‘কালোমাথা মুনিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এরা দুটি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ হয়ে গেছে। একটি খয়েরি বা ত্রিরঙা মুনিয়া, অন্যটি তামাটে বা কালোমাথা মুনিয়া।
ত্রিরঙা মুনিয়ার ইংরেজি নাম Tricoloured Munia। বৈজ্ঞানিক নাম Lonchura malacca। এরা Estrildidae পরিবারের এক প্রজাতির শান্ত প্রকৃতির ছোট পাখি। সাদা, কালো ও খয়েরি রঙের কারণে এর নাম হয়েছে ত্রিরঙা মুনিয়া। এদের বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। কিন্তু শরৎ এলেই এরা দলবদ্ধভাবে কাশবনে বিচরণ করে। কালোবুক বাবুই ও অন্যান্য মুনিয়ার সঙ্গে ঘুরতে এরা পছন্দ করে। তাই ত্রিরঙা মুনিয়াকে সামাজিক পাখি বললে ভুল হবে না।
মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের সভাপতি এম এ মুহিত বলেন, “মেহেরপুর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) পেছনে কাশবনে পাখির ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে দেখি, এ বছর ত্রিরঙা মুনিয়ার সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু শহুরে পরিবেশ গড়ে ওঠার কারণে খড়ের মাঠ অনেক ছোট হয়ে গেছে। সাধারণত মুনিয়া পাখি ঘাসবন পছন্দ করে। ঘাসবন কমে গেলে ঘাসবনে বিচরণ করা পাখিগুলো হুমকির মুখে পড়বে।”
মুনিয়া পাখিরা দলবদ্ধভাবে ধানক্ষেতের ওপর বসে। গ্রামের কৃষকরা মনে করেন, মুনিয়া পাখি ধান খেয়ে ফেলে। তবে এরা মূলত ধানের আগাছার বীজ ও কীটপতঙ্গ খেয়ে থাকে। এদের প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী বললে ভুল হবে না।
মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের উপদেষ্টা ও পরিবেশবিদ এনামুল আজমি বলেন, “মুনিয়া পাখি ক্ষেতে আগাছার বীজ খেয়ে বিভিন্ন স্থানে ফলার কারণে ঘাসবন সৃষ্টি হয় এবং ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। ঘাস ও পাখিদের রক্ষা করতে হলে আমাদের গ্রামের কৃষকদের বেশি সচেতন হতে হবে।”
মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের উপদেষ্টা ও পৌর কলেজের ভূগোল শিক্ষক মাসুদ রেজা বলেন, “সুন্দর এই মুনিয়া পাখি অনেকে শখের বশে খাঁচায় বন্দি করে ঘরে পোষেন। আবার পাখির দোকানে এই ধরনের আবাসিক পাখি বিক্রি করতেও দেখা যায়। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও প্রকৃতি রক্ষা করতে হলে আমাদের সব স্তরের মানুষকে এদের রক্ষায় সচেতন হতে হবে।”
পরিবেশ নিয়ে কাজ করে স্থানীয় সংগঠন সুবাহ। এর নির্বাহী পরিচালক মঈনুল আলম বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে, মেহেরপুর বার্ড ক্লাব প্রকৃতি ও পাখি রক্ষায় কাজ করছে এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে প্রতিনিয়ত সচেতন করছে।”
আরএন