ভোলার অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র চরফ্যাশন উপজেলার চর কুকরী-মুকরী, ঢালচরের তারুয়া সৈকত ও আশপাশের চরাঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম প্রবেশদ্বার চর কচ্ছপিয়া খেয়াঘাট ও স্পিডবোট ঘাট। এই ঘাটে এখন যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন শত শত সাধারণ যাত্রী ও দেশি-বিদেশি পর্যটক এই ঘাট ব্যবহার করলেও স্থানীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় এবং প্রতিবাদ করলে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পর্যটকদের অভিযোগ, চর কচ্ছপিয়া থেকে চর কুকরী-মুকরী রুটে চলাচলকারী ট্রলার ও স্পিডবোটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ, ক্ষেত্রবিশেষে তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঘাটে কোনো ভাড়ার তালিকা (রেট চার্ট) টাঙানো নেই। ফলে চালক ও ঘাট ইজারাদারের নিয়োজিত ব্যক্তিরা যাত্রীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন বলে অভিযোগ।
চর কুকরী-মুকরী থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ট্রলার ও লঞ্চ। দূরত্বভেদে ট্রলারে সময় লাগে ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট এবং এতে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ লিটার জ্বালানি লাগে। বিগত সরকারের আমলে এই পথে খেয়া ভাড়া ছিল ৪০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কয়েক মাস ভাড়া ৭০ টাকা বহাল ছিল। পরবর্তীতে জ্বালানি তেলের সংকট দেখিয়ে খেয়া ভাড়া একলাফে ৮০ থেকে ৯০ টাকা করা হয়। কিন্তু বাজারে তেলের সরবরাহ ও সংকট দূর হলেও সেই বর্ধিত ভাড়া আর কমানো হয়নি। সম্প্রতি তা বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মেহনতি মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের যাতায়াত এখন চরম ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
যাত্রী ভাড়ার পাশাপাশি ঘাট ভাড়ার নামেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রলার ভাড়ার বাইরেও ঘাটে ওঠানামার জন্য অতিরিক্ত খাজনা বা চাঁদা দিতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা প্রতিবাদ করলে ঘাটের ইজারাদার ও সিন্ডিকেটের লোকজনের হাতে সাধারণ মানুষকে লাঞ্ছিত হতে হয়। এমনকি প্রতিবাদকারী যাত্রীদের আটকে রাখার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সন্ধ্যার পর বা বৈরী আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভাড়ার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কুকরী-মুকরী ও কচ্ছপিয়ার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
হুমকির মুখে পর্যটনশিল্প
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তারুয়া সৈকত ও চর কুকরী-মুকরীতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন। কিন্তু চর কচ্ছপিয়া ঘাটে পা রাখতেই পর্যটকদের যে ধরনের হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়ার মুখোমুখি হতে হয়, তাতে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অনেক পর্যটক ঘাট এলাকার অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যটনশিল্প ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলাকাবাসী ও পর্যটকদের দাবি, অবিলম্বে চর কচ্ছপিয়া খেয়াঘাট ও স্পিডবোট ঘাটে সরকারিভাবে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙাতে হবে। একই সঙ্গে ঘাটগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং পর্যটনশিল্পকে রক্ষা করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ জানান, চর কুকরী-মুকরী রুটে ট্রলারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং ঘাটে সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কোনো সিন্ডিকেট বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই। একটি তদন্ত দল পাঠানো হবে। সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঘাট ইজারাদার ও ট্রলার মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
‘প্রকৃতির মিনি সুন্দরবন’ খ্যাত এই দ্বীপের পর্যটন সম্ভাবনা পরিবহন ব্যবস্থার অনিয়মের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে ঘাটকেন্দ্রিক অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ ও ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
এসএফ/আরএন