ইংলিশ ফুটবলের বহুল আলোচিত আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের মামলায় ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের আনা ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতে ক্লাবটিকে দায়ী করেছে স্বাধীন কমিশন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
তবে এই রায়ের পরও মামলাটির প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি এবং ক্লাবটির আপিলের সুযোগ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ও এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ২৫ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে জানায়, দীর্ঘ তদন্তের পর একটি স্বাধীন প্যানেল ম্যানচেস্টার সিটিকে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক বিধি ভঙ্গের অভিযোগে দায়ী করেছে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার বছর ধরে চলা তদন্ত শেষে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ১১৫টি অভিযোগ আনে প্রিমিয়ার লিগ। অভিযোগগুলোর সময়কাল মূলত ২০০৯-১০ থেকে ২০২২-২৩ মৌসুম পর্যন্ত। মামলাটি পরে তিন সদস্যের একটি স্বাধীন কমিশনের কাছে যায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুনানি শুরু হয় এবং ওই বছরের ডিসেম্বরে তা শেষ হয়।
১১৫টি অভিযোগ একই ধরনের নয়। এর মধ্যে ক্লাবটির আর্থিক হিসাব, খেলোয়াড় ও ম্যানেজারের পারিশ্রমিক, উয়েফার আর্থিক বিধি, প্রিমিয়ার লিগের লাভ ও আর্থিক স্থায়িত্বের নিয়ম এবং তদন্তে সহযোগিতা না করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—
• ৫৪টি নির্ভুল ও হালনাগাদ আর্থিক তথ্য দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ;
• ১৪টি খেলোয়াড় ও ম্যানেজারের পারিশ্রমিক-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে না দেওয়ার অভিযোগ;
• পাঁচটি উয়েফার আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ;
• সাতটি প্রিমিয়ার লিগের লাভ ও আর্থিক স্থায়িত্বের নিয়ম বা PSR লঙ্ঘনের অভিযোগ;
• ৩৫টি প্রিমিয়ার লিগের তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট
অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ম্যানচেস্টার সিটির আয় ও ব্যয়ের তথ্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে কি না। বিশেষ করে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুমের কয়েকটি সময়ে ক্লাবটির আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
ম্যানচেস্টার সিটি শুরু থেকেই প্রিমিয়ার লিগের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে। ক্লাবটির অবস্থান হলো, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং তারা নিজেদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
রায়ের খবর প্রকাশের পরও ক্লাবটির পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ফলে স্বাধীন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি আপিল পর্যায়েও যেতে পারে।
১১৪টি অভিযোগে দায়ী সাব্যস্ত হওয়ার খবর এলেও ম্যানচেস্টার সিটির জন্য কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
প্রিমিয়ার লিগের বিধি অনুযায়ী আর্থিক ও অন্যান্য গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা কিংবা পয়েন্ট কর্তনের মতো শাস্তির প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে পয়েন্ট কাটা, শিরোপা কেড়ে নেওয়া, অবনমন কিংবা প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কার। এর কোনোটিই এই মুহূর্তে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
তাই শাস্তি ঘোষণার আগে সম্ভাব্য কোনো ব্যবস্থাকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মামলাটির প্রভাব ম্যানচেস্টার সিটির বাইরেও যেতে পারে। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব যদি প্রমাণ করতে পারে যে ম্যানচেস্টার সিটির কথিত বিধি লঙ্ঘনের কারণে তারা আর্থিক বা ক্রীড়া-ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাহলে ক্ষতিপূরণ দাবি নিয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ইংলিশ ফুটবলে আর্থিক বিধি লঙ্ঘন নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু আইনি বিরোধও নজির হিসেবে সামনে আসতে পারে। তবে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এমন তথ্য এখনো নেই।
ম্যানচেস্টার সিটির মামলাটি ইংলিশ ফুটবলে আর্থিক বিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর সময়কালে ক্লাবটি ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম সফল দলে পরিণত হয় এবং একাধিক প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতে।
ফলে মামলার চূড়ান্ত ফল শুধু ম্যানচেস্টার সিটির ওপরই প্রভাব ফেলবে না; প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক বিধি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, বড় ক্লাবগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ড কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং প্রতিযোগিতার ভারসাম্য রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা কতটা কার্যকর। এসব প্রশ্নেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে শাস্তি কার্যকর করার সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে কোনো ক্রীড়া-শাস্তি পরে কার্যকর হলে সেটি কোন মৌসুমে এবং কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতে ম্যানচেস্টার সিটিকে দায়ী করার খবর মামলাটিতে বড় মোড় এনেছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়, শাস্তি এবং সম্ভাব্য আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত অধ্যায় বলা যাচ্ছে না।
এফএস